Baruipur Horror Case: ‘অ্যান্টিমোর্টেম ড্রাউনিং’, মাথায় আঘাত ও যৌন নির্যাতনের পর জ্যান্ত অবস্থায় বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলা হয় বারুইপুরের নাবালিকাকে! শিউরে ওঠা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট

source : এইসময় অনলাইন
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে (Baruipur) ১১ বছরের এক স্কুলছাত্রীর ওপর হওয়া মধ্যযুগীয় বর্বরতার যে খতিয়ান সামনে আসছে, তা সভ্য সমাজকে লজ্জায় মাথা নিচু করতে বাধ্য করবে। রবিবারই কাটাপুকুর মর্গে ওই খুদের শরীরের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার ময়নাতদন্তের যে প্রাথমিক রিপোর্ট (Preliminary Post-Mortem Report) সামনে এসেছে, তা এককথায় হাড়হিম করা। নরপশুরা স্রেফ পাশবিক অত্যাচার করেই শান্ত হয়নি, অচৈতন্য অবস্থায় জ্যান্ত মেয়েটিকে বস্তাবন্দি করে ডুবিয়ে মারে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট: কী এই ‘অ্যান্টিমোর্টেম ড্রাউনিং’?
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই নাবালিকার ওপর তীব্র শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছে। তার যৌনাঙ্গে গভীর ক্ষত রয়েছে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে আঁচড় ও কামড়ের দাগ মিলেছে, যা প্রমাণ করে মৃত্যুর আগে কতটা নির্মম অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে।
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, মেয়েটির মাথায় একটি বড় ক্ষত রয়েছে। কোনো ভারী বস্তু দিয়ে সজোরে আঘাত করে বা দেওয়ালে মাথা ঠুকে দিয়ে তাকে প্রথমে অচৈতন্য করা হয়েছিল। এরপর অপরাধীরা ভেবেছিল সে মারা গিয়েছে, অথবা প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে অচৈতন্য অবস্থাতেই তাকে একটি বস্তায় পুরে সূর্যপুরের রেললাইনের ধারের পুকুরে ফেলে দেয়। রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, ‘অ্যান্টিমোর্টেম ড্রাউনিং’ (Antemortem Drowning)— অর্থাৎ যখন তাকে জলে ফেলা হয়েছিল, তখন তার হৃদস্পন্দন সচল ছিল। মেয়েটির ফুসফুস ও পাকস্থলীতে জল পাওয়া গিয়েছে। মাথার ক্ষত থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং সবশেষে ফুসফুসে জল ঢুকে দম আটকে মৃত্যু হয় তার। কী ঘটেছিল বারুইপুরে? (ঘটনার প্রেক্ষাপট)
গত শনিবার (৪ জুলাই) বিকেলে নিজের এক বন্ধুর জন্মদিনের উপহার বা গিফট কিনতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ১১ বছরের ওই নাবালিকা। দীর্ঘক্ষণ কেটে গেলেও সে বাড়ি না ফেরায় উদ্বিগ্ন পরিবার রাতেই বারুইপুর থানায় নিখোঁজ ডায়েরি (Missing Diary) করে। পুলিশ ও স্থানীয়রা রাতেই তদন্তে নেমে এলাকার একটি সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ পায়, যেখানে দেখা যায় চার জন ব্যক্তি ওই নাবালিকাকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছে।
পরদিন, অর্থাৎ ৫ জুলাই রবিবার সকালে নাবালিকার বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ধবধবি ও সূর্যপুর স্টেশনের মাঝামাঝি জায়গায় রেললাইনের ধারের একটি পুকুর থেকে তার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার হয়।
[বারুইপুর কাণ্ডের ভয়ংকর ক্রোনোলজি]
৪ জুলাই (শনিবার বিকেল): বন্ধুর উপহার কিনতে গিয়ে নিখোঁজ হয় ১১ বছরের নাবালিকা।
৪ জুলাই (শনিবার রাত): সিসিটিভি ফুটেজে ৪ জনের সাথে নাবালিকাকে জোর করে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
৫ জুলাই (রবিবার সকাল): রেললাইনের ধারের পুকুর থেকে বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার, উত্তাল বারুইপুর।
৫ জুলাই (রবিবার দুপুর): ক্ষিপ্ত জনতার গণপিটুনিতে ইন্দ্রজিৎ তাঁতি (২৬) নামের এক সন্দেহভাজনের মৃত্যু।
৬ জুলাই (সোমবার): ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে জ্যান্ত জলে ডুবিয়ে মারার (Antemortem Drowning) প্রমাণ।
গণপিটুনি ও প্রশাসনিক তৎপরতা
রবিবার সকাল থেকেই এই জঘন্য কাণ্ডের প্রতিবাদে আগুন জ্বলে ওঠে বারুইপুরে। ক্ষিপ্ত জনতা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে এবং ভাঙচুর চালায়। এরই মধ্যে ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে ইন্দ্রজিৎ তাঁতি (২৬) নামে এক যুবককে ধরে গণপিটুনি (Mob Lynching) দেয় উত্তেজিত জনতা। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বারুইপুর, সোনারপুর ও নরেন্দ্রপুর থানা এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহতির ১৬৩ ধারা (সাবেক ১৪৪ ধারা) বলবৎ করেছে প্রশাসন। এই মামলার তদন্তে অ্যাডিশনাল এসপি পিনাকী দত্তের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় ২ জনকে গ্রেপ্তার ও ৩ জনকে আটক করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তা ও ভবানী ভবনে ডাক
ঘটনার তীব্রতা বিচার করে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রবিবারই নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন এবং দোষীদের সর্বোচ্চ আইনি শাস্তি দেওয়ার আশ্বাস দেন। নাবালিকার বাবা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী আগামী মঙ্গলবার (৭ জুলাই) তাঁদের কলকাতার ভবানী ভবনে (Bhabani Bhaban) দেখা করার জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন, যেখানে এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
এক নজরে বারুইপুর কাণ্ডের বিবরণ:
| নির্যাতিতা ও বয়স | মৃত্যুর মূল কারণ (Medical Cause) | শরীরে ক্ষত ও চিহ্ন | বর্তমান আইনি পরিস্থিতি | পরবর্তী বড় পদক্ষেপ |
| ১১ বছরের নাবালিকা (সূর্যপুর, বারুইপুর) | অ্যান্টিমোর্টেম ড্রাউনিং (মাথায় আঘাত ও জলে ডুবে দম আটকানো)। | যৌনাঙ্গে আঘাত, মাথায় গভীর ক্ষত, শরীরে কামড় ও আঁচড়ের দাগ। | এলাকায় ১৬৩ ধারা জারি; ৬ সদস্যের সিট (SIT) গঠিত; ২ জন ধৃত, ৩ জন আটক। | আগামী মঙ্গলবার (৭ জুলাই) নির্যাতিতার পরিবার দেখা করবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাথে। |
বারুইপুরের এই ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট আইনের দরবারে অপরাধীদের ফাঁসির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য অন্যতম বড় হাতিয়ার হতে চলেছে। একটি নিষ্পাপ শিশুকে যেভাবে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে জ্যান্ত অবস্থায় জলে ডুবিয়ে মারা হলো, তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চেয়ে সরব গোটা রাজ্য।






