Syllabus Change in Bengal: স্কুলের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, মুছছে মমতার সিঙ্গুর আন্দোলন! মিত্র ইনস্টিটিউশনে ২৫ লক্ষ টাকা অনুদান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

source : আনন্দবাজার
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ও ইতিহাসের পাতায় এক মস্ত বড় পরিবর্তনের ব্লু-প্রিন্ট সামনে আনল নতুন রাজ্য সরকার। স্কুলের পাঠ্যবই থেকে এবার পাকাপাকিভাবে মুছে যেতে চলেছে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক ভিত্তি ‘সিঙ্গুর আন্দোলন’ (Singur Movement)। তার পরিবর্তে সেখানে জায়গা করে নিচ্ছেন জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (Syama Prasad Mookerjee)। সোমবার ভবানীপুরের ‘মিত্র ইনস্টিটিউশন’ (Mitra Institution)— যেখানে স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদ পড়াশোনা করেছিলেন, সেখানেই তাঁর ১২৫তম জন্মজয়ন্তীর মঞ্চ থেকে এই যুগান্তকারী ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)।
‘টাটা তাড়ানোর ইতিহাস থাকবে না’, সিলেবাস কমিটিকে প্রস্তাব শুভেন্দুর
সোমবার মিত্র ইনস্টিটিউশনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন এবং উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। দুই মন্ত্রীকে সাক্ষী রেখেই মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষার সিলেবাসে বদল আনা অত্যন্ত জরুরি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘পাঠ্যবইতে অবশ্যই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানের প্রসঙ্গ থাকা উচিত। আর যাঁরা টাটাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়েছেন, তাঁদের উল্লেখ থাকা উচিত নয়। আমি স্কুলশিক্ষামন্ত্রী, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী এবং তাঁদের সচিবদের এই বিষয়ে অনুরোধ করেছি। আগামী দিনে যে সিলেবাস কমিটি গঠিত হবে, তাদের কাছে আমি ভবানীপুরের বিধায়ক হিসেবে এই আবেদন ও প্রস্তাব রাখব।’’
অবশ্য শুভেন্দুবাবু এও স্পষ্ট করে দেন যে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সিলেবাস কমিটিই, কোনো রাজনৈতিক দল নয়। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর স্কুলের পাঠ্যসূচিতে সিঙ্গুর আন্দোলন ও টাটাগোষ্ঠীর বিদায়ের ইতিহাস যুক্ত করা হয়েছিল। নতুন সরকার এবার তা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করল।
মিত্র ইনস্টিটিউশনে ২৫ লক্ষ টাকা অনুদান ও হেরিটেজ তকমা
১৯০৬ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত মিত্র ইনস্টিটিউশনের ছাত্র ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে ১৯২৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি এই স্কুলের পরিচালন সমিতির সভাপতির দায়িত্বও সামলান। প্রিয় নেতার স্মৃতিবিজড়িত এই স্কুলের উন্নয়নের জন্য নিজের বিধায়ক তহবিল থেকে ২৫ লক্ষ টাকা অনুদান ঘোষণা করেন ভবানীপুরের বিধায়ক তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি, বিগত সরকার হেরিটেজ কমিশন তুলে দিয়েছিল বলে সমালোচনা করে তিনি জানান, নতুন হেরিটেজ কমিশন গঠিত হলে এই স্কুল ভবনটিকে হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
[শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতি রক্ষায় রাজ্য সরকারের বড় ৩ পদক্ষেপ]
১. ২০০ কোটি টাকার বাজেট: স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের কমিটি গঠন।
২. আধুনিক লাইব্রেরি: হুগলির বলাগড়ের জিরাটে জমি কিনে চুক্তি সম্পন্ন, যেখানে তৈরি হবে অত্যাধুনিক গ্রন্থাগার।
৩. আন্তঃরাজ্য আলোচনা: ঝাড়খণ্ডের মধুপুরে শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি সংরক্ষণের জন্য ঝাড়খণ্ড সরকারের সাথে বৈঠক।
‘চলবে না মোগল সাম্রাজ্য, থাকবে সনাতন’— তুঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মদিবস উপলক্ষ্যে সোমবার রাজ্যজুড়ে একাধিক কর্মসূচি পালিত হয়। কাঁথিতে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর ছোট ভাই তথা কাঁথির বিজেপি সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারীও শ্যামাপ্রসাদের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে আনার দাবি জানান।
তবে সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্যটি এসেছে হুগলির বলাগড়ের জিরাটে আয়োজিত অনুষ্ঠান থেকে। সেখানে যোগ দিয়ে রাজ্যের মন্ত্রী সুমনা সরকার বলেন—
“নিশ্চয়ই এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করব। মোগল সাম্রাজ্য আর চলবে না ইতিহাসের পাতায়। ইতিহাসের পাতায় থাকবে সনাতন সাম্রাজ্য।”
অন্যদিকে, এই সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাতি বাণীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেন, “পাঠ্যপুস্তকে আনা সম্পূর্ণটাই সরকারি বিষয়। তবে শুধু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নন, তাঁর ভাইদের নামগুলোও যেন থাকে। বিভিন্ন দিক থেকে দীর্ঘ দিন ধরে তাঁরা বাংলায় বঞ্চিত হয়েছিলেন।”
এক নজরে পাঠ্যসূচি বদল ও সরকারি সিদ্ধান্ত:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব |
| নতুন সংযোজন | স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনী ও বাংলার প্রতি অবদান। |
| বাদ যাচ্ছে যা | টাটা গোষ্ঠী বিতাড়ন সহ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সিঙ্গুর আন্দোলন। |
| আর্থিক অনুদান | মিত্র ইনস্টিটিউশনের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিধায়ক তহবিল থেকে ২৫ লক্ষ টাকা। |
| মেগা প্রজেক্ট | ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটি; হুগলির জিরাটে আধুনিক লাইব্রেরি নির্মাণ। |
| ইতিহাসের মোড় | পাঠ্যবই থেকে মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস সংকুচিত করে ‘সনাতন সাম্রাজ্য’ আনার ইঙ্গিত। |
নতুন বিজেপি সরকারের এই সিলেবাস বদলের সিদ্ধান্ত রাজ্যের শিক্ষা ও রাজনৈতিক মহলে এক নতুন ঝড় তুলতে চলেছে। একদিকে টাটা বিতাড়নের ইতিহাসকে ‘নেতিবাচক’ আখ্যা দিয়ে তা মুছে ফেলা এবং অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও ‘সনাতন সাম্রাজ্য’কে সামনে আনা— শিক্ষা গৈরিকীকরণের এই বিতর্কিত লড়াই আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।






