Ahmedabad Blasts Verdict: আমেদাবাদ ধারাবাহিক বিস্ফোরণ মামলায় ঐতিহাসিক রায়! ৪৯ জঙ্গির সাজা বহাল রাখল গুজরাট হাই কোর্ট, ৩৮ জনের ফাঁসি ও ১১ জনের যাবজ্জীবন

source : সংবাদ প্রতিদিন
প্রায় ১৮ বছর আগে গুজরাটের আমেদাবাদকে রক্তে রাঙিয়ে দেওয়া ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণ মামলায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক রায় দিল গুজরাট হাই কোর্ট (Gujarat High Court)। বিশেষ আদালতের দেওয়া রায়কে চ্যালেঞ্জ করে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ৪৯ জন অপরাধীর করা সমস্ত আবেদন মঙ্গলবার (৭ জুলাই) খারিজ করে দিয়েছে উচ্চ আদালত। ফলে জঙ্গি গোষ্ঠী ‘ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন’ (Indian Mujahideen)-এর ৩৮ জন সদস্যের ফাঁসি এবং ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পূর্বঘোষিত সাজাই বহাল রইল। বিচারপতি এ ওয়াই কোগজে এবং বিচারপতি সমীর জে ডেভের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় শোনায়।
৭০ মিনিটে ২১টি বিস্ফোরণ, কেঁপে উঠেছিল গুজরাট
২০০৮ সালের ২৬ জুলাই দিনটি ভারতের ইতিহাসে অন্যতম এক কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত। সেদিন গুজরাটের বাণিজ্যিক রাজধানী আমেদাবাদের বিভিন্ন জনবহুল এলাকা, বাস, সাইকেল, গাড়ি এমনকি সিভিল হাসপাতাল ও এলজি হাসপাতালের মতো চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোকে নিশানা করে মাত্র ৭০ মিনিটের ব্যবধানে ২১টি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। এই নারকীয় হামলায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৫৬ জন এবং আহত হন ২৪০ জনেরও বেশি মানুষ।
তদন্তে নেমে গুজরাট পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ জানতে পারে, নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী জঙ্গি সংগঠন ‘স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া’ (SIMI)-র একটি অংশ ‘ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন’ ছদ্মনামে এই নাশকতার ছক কষেছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল, ২০০২ সালের গোধরা কাণ্ড ও পরবর্তী গুজরাট দাঙ্গার প্রতিশোধ নেওয়া।
বিশেষ আদালতের রায় ও হাই কোর্টের সিলমোহর
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং ১,১৬৩ জন সাক্ষীর বয়ান রেকর্ড করার পর, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেদাবাদের বিশেষ আদালত (Special Court) মামলার রায় ঘোষণা করেছিল। তৎকালীন বিশেষ বিচারক মামলার ৭৭ জন অভিযুক্তের মধ্যে ২৮ জনকে প্রমাণের অভাবে খালাস দেন এবং বাকি ৪৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। এই ৪৯ জনের মধ্যেই ৩৮ জনকে বিরলতম অপরাধের (Rarest of Rare Cases) আওতায় এনে ফাঁসির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ১১ জনকে দেওয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
দোষীরা এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হলেও শেষরক্ষা হলো না। মঙ্গলবার গুজরাট হাই কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, বিশেষ আদালতের রায়ে কোনো ভুল ছিল না। দেশ এবং তার নাগরিকদের নিরাপত্তা ও শান্তিরক্ষার স্বার্থে এই ধরণের ভয়ঙ্কর জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত থাকা অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি বজায় রাখাই একমাত্র পথ।
[আমেদাবাদ বিস্ফোরণ মামলার আইনি খতিয়ান]
* মামলার মোট অভিযুক্ত: ৭৭ জন (১ জন সরকারি সাক্ষী হন)।
* বিশেষ আদালতের রায় (২০২২): ২৮ জন খালাস, ৪৯ জন দোষী সাব্যস্ত।
* ফাঁসির দণ্ডাদেশ: ৩৮ জন জঙ্গি (ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন ও সিমি সদস্য)।
* যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: ১১ জন সহযোগী অপরাধী।
* গুজরাট হাই কোর্টের রায় (৭ জুলাই, ২০২৬): সমস্ত আপিল খারিজ, সাজা ১০০% বহাল।
কেন ১১ জনকে ফাঁসি নয়? আদালতের ব্যাখ্যা
মামলার শুনানিতে আদালত এটিও পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, কেন বাকি ১১ জনকে ফাঁসির বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। রায়ে বলা হয়েছে, এই ১১ জন মূল চক্রীদের সাথে হাত মিলিয়ে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়েছিল এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল ঠিকই, কিন্তু মূল বিস্ফোরণ ঘটানো বা আইইডি (IED) তৈরির ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা সরাসরি ফাঁসি দেওয়ার মতো স্তরের ছিল না। সেই কারণেই তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ বহাল রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আদালতের তরফে। হাই কোর্টের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন বিস্ফোরণে নিহতদের পরিবার ও স্বজনেরা। তাঁদের দাবি, এবার যেন দ্রুত এই সাজা কার্যকর করা হয়।
এক নজরে আমেদাবাদ ধারাবাহিক বিস্ফোরণ মামলা:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | মামলার মূল বিবরণ ও আদালতের নির্দেশ |
| ঘটনার তারিখ | ২৬ জুলাই, ২০০৮ (২১টি জায়গায় বিস্ফোরণ)। |
| হতাহতের সংখ্যা | ৫৬ জনের মৃত্যু, ২০০-র বেশি মানুষ গুরুতর জখম। |
| দোষী জঙ্গি সংগঠন | ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন (IM) / সিমি (SIMI)। |
| সর্বোচ্চ শাস্তি | ৩৮ জনের মৃত্যুদণ্ড (হাই কোর্ট দ্বারা নিশ্চিত)। |
| অন্যান্য সাজা | ১১ জনের আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। |
| রায় প্রদানকারী বেঞ্চ | বিচারপতি এ ওয়াই কোগজে এবং বিচারপতি সমীর জে ডেভ। |
গুজরাট হাই কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায় দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর আমজনতার ভরসা আরও বাড়িয়ে দিল। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি যে কতটা অনমনীয়, এই রায় তারই প্রমাণ। আইনজ্ঞদের মতে, হাই কোর্টের এই সীলমোহরের পর দোষীদের সামনে এখন কেবল সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার রাস্তা খোলা রইল।






