Kolkata Rain Update: রাতভর টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন কলকাতা ও চার জেলা! চাকা ডুবল বাসের, বিমানবন্দরে ব্যাহত পরিষেবা, দুর্যোগের জেরে আকাশপথ বদল মুখ্যমন্ত্রীর

source : আনন্দবাজার
আষাঢ়ের শেষলগ্নে এসে দক্ষিণবঙ্গে সক্রিয় বর্ষা। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টির কারণে কলকাতা এবং শহরতলিতে ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। কলকাতা ছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া এবং হুগলির বিস্তীর্ণ অংশ জলের তলায়। শুক্রবার সকালেই মধ্য কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডে একটি বিশাল গাছ উপড়ে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল থমকে যায়। অফিসযাত্রী থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের পড়ুয়ারা সকাল থেকেই জলযন্ত্রণা সহ্য করে গন্তব্যে পৌঁছচ্ছেন। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কোপ পড়েছে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Chief Minister Suvendu Adhikari) প্রথম মুর্শিদাবাদ সফরেও।
জলের তলায় ভিআইপি রোড ও বিমানবন্দর, বিকল একাধিক গাড়ি
উত্তর কলকাতা এবং শহরতলির দিকে বৃষ্টির পরিমাণ দক্ষিণ কলকাতার তুলনায় অনেকটাই বেশি। সবথেকে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ভিআইপি রোডের (VIP Road) ওপর। চিনার পার্ক এলাকার ৪৫ নম্বর বাসস্ট্যান্ড সম্পূর্ণ জলমগ্ন। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সরকারি ও বেসরকারি বাসের চাকা জলের তলায় ডুবে থাকতে দেখা যায়।
শুক্রবার সকালে চিনার পার্কের জমা জল পেরিয়ে যাওয়ার সময় একটি ছোট চারচাকার গাড়ি মাঝরাস্তায় বিকল হয়ে অর্ধাংশ জলের নিচে চলে যায়। পরবর্তীতে ট্রাফিক পুলিশ ক্রেন এনে গাড়িটি উদ্ধার করে। এ ছাড়া কৈখালি, দমদম, বরাহনগর, সোদপুর ও ব্যারাকপুরের নিচু এলাকাগুলি জলমগ্ন। কলকাতা বিমানবন্দরের (Kolkata Airport) অ্যাপ্রোচ রোড জলে ডুবে যাওয়ায় যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। খারাপ আবহাওয়ার কারণে বেশ কিছুক্ষণের জন্য বিমান ওঠানামাও ব্যাহত হয়েছে। হুগলির চুঁচুড়া পুরসভার মিলিটারি কলোনি, ধরমপুর এবং ব্যান্ডেল স্টেশনের সাবওয়েতে জল জমে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন।
“উদ্বেগের কারণ নেই, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে”— দাবি পুরসভার
শহরের এই জলযন্ত্রণা এবং নিকাশি ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়ে সরব হয়েছে আমজনতা। যদিও কলকাতা পুরসভা (KMC) ও ট্রাফিক পুলিশের দাবি, পরিস্থিতি এখনো হাতের বাইরে যায়নি। সকাল ১১টা পর্যন্ত শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও দুপুরের দিকে বৃষ্টির দাপট বাড়ায় কিছু জায়গায় জল জমেছে।
কলকাতা পুরসভার নিকাশি বিভাগের এক আধিকারিক আশ্বস্ত করে জানান—
“শহরে এখনো অস্বাভাবিক বা মেঘভাঙা বৃষ্টি হয়নি, তাই উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। জল দ্রুত বের করার জন্য শহরের সমস্ত পাম্পিং স্টেশন এবং ছোট-বড় বুস্টার পাম্পগুলি চালু রাখা হয়েছে। গঙ্গার লকগেটগুলি সঠিক সময়ে খোলা ও বন্ধ করার কাজ চলছে। আমাদের নিকাশি কর্মীরা রাস্তায় সশরীরে উপস্থিত রয়েছেন। তবে এক ঘণ্টার মধ্যে যদি ৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়ে যায়, তখনই কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়। আমরা সবরকম পরিস্থিতির জন্য তৈরি।”
[দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়া ও পুরসভার অ্যাকশন রিপোর্ট]
* বৃষ্টিপাতের মেয়াদ: আগামী সোমবার (১৩ জুলাই, ২০২৬) পর্যন্ত ঝড়-বৃষ্টি জারি থাকবে।
* ঝোড়ো হাওয়া: বৃষ্টির সাথে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিমি বেগে হাওয়া বইতে পারে।
* ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস: দক্ষিণ ২৪ পরগনা, দুই মেদিনীপুর, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ ও পূর্ব বর্ধমান।
* পুরসভার পরিকাঠামো: সমস্ত পাম্পিং স্টেশন সক্রিয়, রাস্তায় মোতায়েন নিকাশি স্কোয়াড।
আবহাওয়ার জেরে থমকাল মুখ্যমন্ত্রীর কপ্টার, সড়কপথে মুর্শিদাবাদে শুভেন্দু
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মসূচিতে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আজই তাঁর প্রথম মুর্শিদাবাদ সফর ছিল। পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে কলকাতা থেকে আকাশপথে (হেলিকপ্টারে) তাঁর মুর্শিদাবাদ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং দৃশ্যমানতা কম থাকায় কপ্টার ওড়ানোর অনুমতি দেননি এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।
তৎক্ষণাৎ সূচি পরিবর্তন করে সড়কপথেই মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতা থেকে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক (NH-12) ধরে বহরমপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন তিনি। নবান্ন সূত্রে খবর, বিকেল ৩টে নাগাদ বহরমপুরের রবীন্দ্র সদনে মুর্শিদাবাদ জেলার প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠক করবেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরপর রেজিনগরে একটি জনসভা এবং সন্ধ্যায় বহরমপুরের একটি হোটেলে দলীয় সাংগঠনিক বৈঠকে যোগ দেবেন তিনি।
এক নজরে কলকাতা ও শহরতলির বৃষ্টি চিত্র:
| আক্রান্ত ও প্রভাবিত ক্ষেত্র | বর্তমান পরিস্থিতি ও আপডেট |
| সবচেয়ে বেশি জলমগ্ন এলাকা | চিনার পার্ক, কৈখালি, দমদম, বরাহনগর, ব্যারাকপুর, চুঁচুড়া। |
| পরিবহন বিপর্যয় | ভিআইপি রোডে তীব্র যানজট, ব্যান্ডেল সাবওয়ে বন্ধ, স্ট্র্যান্ড রোডে গাছ উপড়ে বিপত্তি। |
| বিমান পরিষেবা | খারাপ দৃশ্যমানতা ও দুর্যোগের কারণে সাময়িকভাবে ওঠানামায় বিঘ্ন। |
| মুখ্যমন্ত্রীর সফর | আকাশপথ বাতিল, সড়কপথে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক দিয়ে বহরমপুর যাত্রা। |
| হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস | সোম ও মঙ্গলবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গে ভারী এবং উত্তরবঙ্গে অতিভারী বৃষ্টি। |
পুরসভা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করলেও, প্রতি বছরের মতো এবারও সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই যেভাবে কলকাতার প্রবেশদ্বার অর্থাৎ ভিআইপি রোড বা বিমানবন্দর চত্বর জলের তলায় চলে গেল, তা প্রশাসনের বর্ষা-প্রস্তুতির কঙ্কালসার রূপটাই সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরল। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস সত্যি করে যদি সোমবার পর্যন্ত এইরকম অবিরাম বৃষ্টি চলতে থাকে, তবে কলকাতা ও শহরতলির পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। পাম্প চালিয়ে জল নামানোর পাশাপাশি ট্রাফিক সচল রাখাই এখন প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।






