US Sanctions on India: ‘বন্ধু’ ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর তোড়জোড় ট্রাম্প প্রশাসনের! রুশ তেল কেনাই কি কাল হলো নয়াদিল্লির? মার্কিন বিলে বাড়ছে চরম উদ্বেগ

source : সংবাদ প্রতিদিন
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রসায়ন ও ভারত-মার্কিন ‘বন্ধুত্ব’ নিয়ে যত চর্চাই হোক না কেন, বাণিজ্যের প্রশ্নে ওয়াশিংটন যে একচুলও জমি ছাড়তে রাজি নয়, তা আবার প্রমাণিত হলো। এবার ‘বন্ধু’ ভারতের উপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক চাপাবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প! হোয়াইট হাউসের পরোক্ষ সম্মতিতে মার্কিন প্রশাসন ও সেনেটররা যৌথভাবে এমন এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা ট্যারিফ বিল আনার প্রস্তুতি সারছেন, যা কার্যকর হলে ভারতীয় রফতানি বাণিজ্য এবং দেশের তেলের বাজারে এক চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
‘স্যাঙ্কশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট ২০২৫’: বিপাকে ভারত ও চীন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা বা সেনেটের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল— রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট থেকে দু’জন করে মোট চারজন সেনেটর এই নতুন বিলের খসড়া তৈরি করেছেন। বিলের মূল উদ্দেশ্য হলো ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। এই আইনের আওতায় বলা হয়েছে, যে সমস্ত দেশ এখনও রাশিয়া থেকে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, ইউরেনিয়াম এবং অন্যান্য পেট্রোপণ্য আমদানি করে ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ তহবিলে ইন্ধন জোগাচ্ছে, তাদের ওপর অন্তত ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক আমদানি শুল্ক চাপানো হবে।
ভারতের পাশাপাশি চীনও এই বিলের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। বিলের নেপথ্যে থাকা অন্যতম কট্টরপন্থী মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম (Lindsey Graham) গত বছরই ভারতকে সরাসরি হুমকি দিয়ে ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে লিখেছিলেন—
“ভারত এবং চীন— পুতিনের যুদ্ধের মেশিনে আপনারা যদি ইন্ধন জোগাতে থাকেন, তাহলে ভবিষ্যতে নিজেদের ছাড়া আর কাউকে দুষতে পারবেন না।”
ট্রাম্পের কড়া নির্দেশ ও সাময়িক ‘অনুমতি’র অবসান
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দুনিয়া একযোগে রুশ তেল বর্জন করলেও, ভারত নিজের জাতীয় স্বার্থে সস্তায় দেদার রুশ তেল কেনা শুরু করে। প্রথম থেকেই ওয়াশিংটন এই বিষয়টি ভালো চোখে দেখেনি। ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল, তেল বিক্রির অর্থ দিয়েই ইউক্রেনে নির্বিচারে হত্যালীলা চালাচ্ছে রাশিয়া। যার ফলস্বরূপ গত বছর আগস্ট মাসে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছিলেন ট্রাম্প এবং ভারতকে রুশ তেল কেনা বন্ধ করার কড়া ‘নির্দেশ’ দিয়েছিলেন।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের বাজার সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তেলের বিশ্ববাজারের ভারসাম্য ধরে রাখতে এবং তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সে সময়ে নিরুপায় হয়ে ভারতকে রুশ তেল কেনার এক বিশেষ ‘অনুমতি’ বা ছাড় দিয়েছিল মার্কিন প্রশাসন। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই মার্কিন ‘অনুমতি’র মেয়াদ আপাতত ফুরিয়েছে। আর মেয়াদ ফুরোতেই ফের স্বমূর্তি ধারণ করছে ট্রাম্প প্রশাসন।
[আমেরিকার শাস্তিমূলক শুল্কের খতিয়ান ও প্রস্তাব]
* গত বছর আগস্ট (বাস্তবায়িত শুল্ক): রুশ তেল কেনার ‘অপরাধে’ ভারতীয় পণ্যে ২৫% শুল্ক।
* ২০২৬ (নতুন বিলের প্রস্তাব): ‘স্যাঙ্কশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট’-এর অধীনে সর্বোচ্চ ৫০০% শুল্ক।
* ছাড়ের সর্বোচ্চ মেয়াদ: মার্কিন সুরক্ষার খাতিরে প্রেসিডেন্ট চাইলে সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের ছাড় দিতে পারেন।
১৮০ দিনের ছাড় এবং ভারতের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক চাল
প্রস্তাবিত এই কঠোর বিলে একটি ছোট ‘উইন্ডো’ বা ছাড়ের রাস্তাও রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, মার্কিন জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থ ক্ষুণ্ণ না করে যদি কোনো কৌশলগত কারণ থাকে, তবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সংশ্লিষ্ট দেশকে সর্বোচ্চ ১৮০ দিন বা ৬ মাসের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা থেকে সাময়িক ছাড় (Waiver) দিতে পারেন।
বাণিজ্যিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০০ শতাংশ শুল্কের অর্থ হলো মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। টেক্সটাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ এবং রত্ন রফতানির ক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে বড় বাজার হলো আমেরিকা। ফলে এই বিল পাস হলে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ও বাণিজ্য মন্ত্রককে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে চরম দরকষাকষিতে নামতে হবে। তবে নয়াদিল্লি শুরু থেকেই নিজের অবস্থানে অনড় যে, দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে যেখানে কম দামে জ্বালানি পাওয়া যাবে, ভারত সেখান থেকেই তেল আমদানি করবে।
এক নজরে মার্কিন বিল ও ভারতের ওপর তার প্রভাব:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | মার্কিন প্রস্তাবিত বিল ও ভারতের সংকট খতিয়ান |
| বিলের নাম | স্যাঙ্কশনিং রাশিয়া অ্যাক্ট ২০২৫ (Sanctioning Russia Act 2025)। |
| প্রস্তাবিত শুল্কের হার | রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস আমদানিকারী দেশগুলির ওপর ৫০০% পর্যন্ত। |
| বিলের মূল উদ্যোক্তা | মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম-সহ ৪ জন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান সেনেটর। |
| ভারতের অবস্থান | জাতীয় স্বার্থে লাভজনক উৎস থেকে তেল কেনা বজায় রাখা হবে। |
| তাত্ক্ষণিক সংকট | মার্কিন ইরানের যুদ্ধের পর পাওয়া বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়া। |
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (America First) নীতি বরাবরই বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে কঠোর বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপের পক্ষে। তবে ভারতের মতো কৌশলগত মিত্র, যে কি না কোয়াড (QUAD) বা এশিয়ায় চীনের আগ্রাসন রুখতে আমেরিকার প্রধান ভরসা, তার ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর এই প্রস্তাব দু’দেশের ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। এই বিল মার্কিন সেনেটে পাস হওয়া এবং ট্রাম্পের তাতে চূড়ান্ত সই করার আগে নয়াদিল্লির কূটনীতিকরা কীভাবে ওয়াশিংটনকে শান্ত করেন এবং রাশিয়ার সাথে বাণিজ্যের ভারসাম্য বজায় রাখেন, এখন সেটাই দেখার।






