ইনস্টাগ্রামের প্রেমে জঙ্গি জাল! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও মন্ত্রীপুত্রকে ‘হানিট্র্যাপ’ ও অপহরণের ছক, বর্ধমান থেকে গ্রেপ্তার হামিম ও অর্পিতা

পূর্ব ভারতে এক আশঙ্কাজনক জঙ্গি নেটওয়ার্কের জাল বিস্তার করছিল পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী। সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করে প্রভাবশালীদের প্রেমের জালে ফাঁসানো বা ‘হানিট্র্যাপ’ (Honeytrap) করা এবং পরবর্তীতে তাঁদের অপহরণ করার এক রোমহর্ষক ষড়যন্ত্র কষেছিল তারা। তবে সময়মতো পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স (Bengal STF) অভিযান চালিয়ে এই ভয়াবহ চক্রান্ত বানচাল করে দিয়েছে।
ইনস্টাগ্রাম থেকে জঙ্গি ‘মিশন’: কীভাবে শুরু অর্পিতা-হামিমের পথচলা?
হাওড়ার পিলখানার বাসিন্দা হামিম মণ্ডলের বাবা পেশায় দর্জি। পোশাক কারখানা থেকে সংসার চললেও গত কয়েকদিন ধরে খাগড়াগড় থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে বর্ধমানের এক অভিজাত আবাসনে গা-ঢাকা দিয়ে ভাড়া থাকছিল সে।
- সোশ্যাল মিডিয়ায় মগজধোলাই: সোশাল মিডিয়ায় ঘাপটি মেরে বসে থেকে তরুণদের মগজধোলাই করাই ছিল হামিমের প্রাথমিক কাজ। পাক হ্যান্ডেলারদের মাধ্যমে নিজেও চরমপন্থী ভাবধারায় প্রভাবিত হয়।
- অর্পিতার অন্তর্ভুক্তি: চার বছর আগে ইনস্টাগ্রামে ঝাড়খণ্ডের অর্পিতা সরকারের সঙ্গে আলাপ হয় হামিমের। মেসেঞ্জার, টেলিগ্রামে যোগাযোগের পর দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক নিবিড় হয় এবং অর্পিতাকেও নিজের এই জঙ্গি নেটওয়ার্কে টেনে আনে হামিম।
[সন্ত্রাসী ছকের প্রধান পয়েন্টসমূহ]
* নেটওয়ার্ক: পাকিস্তান ভিত্তিক 'শেহজাদ ভাট' গ্রুপ।
* প্রধান অস্ত্র: অর্পিতা সরকারকে সামনে রেখে সোশ্যাল মিডিয়ায় 'হানিট্র্যাপ'।
* প্রাথমিক লক্ষ্য: পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও মন্ত্রী উমেশ রাইয়ের পুত্র।
* প্রধান উদ্দেশ্য: রেইকি করা, অপহরণ ও পূর্ব ভারতে আতঙ্ক তৈরি।
টার্গেটে শুভেন্দু অধিকারী ও মন্ত্রীপুত্র!
শনিবার সাংবাদিক সম্মেলনে বেঙ্গল এসটিএফের আইজি গৌরব শর্মা জানান, এই জুটির কাজ ছিল সম্পূর্ণ থ্রিলার কোনো ওয়েব সিরিজের মতো।
- মুখ্যমন্ত্রীর ওপর নজরদারি: তাদের মূল টার্গেটে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন— সে বিষয়ে রেইকি চালিয়ে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করছিল তারা।
- মন্ত্রীপুত্রকে অপহরণের ছক: অর্পিতাকে সামনে রেখে উত্তর হাওড়ার বিধায়ক তথা রাজ্য মন্ত্রী উমেশ রাইয়ের ছেলেকে প্রেমের ফাদে ফেলার চক্রান্ত করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল হানিট্র্যাপের মাধ্যমে তাঁকে অপহরণ করা।
জিমে সিসিটিভি ফুটেজ ও সাহেবগঞ্জে এসটিএফের ঝটিকা অভিযান
গোপন সূত্রে খবর পেয়ে তদন্তকারীরা প্রথমে ঝাড়খণ্ডের অর্পিতা সরকারকে ট্র্যাক করেন। তার সূত্র ধরে গত বৃহস্পতিবার বর্ধমানের এক অভিজাত আবাসন সংলগ্ন জিম থেকে শরীরচর্চা করার সময় হামিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইতিমধ্যে জিম থেকে হামিমের গ্রেপ্তারের সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে।
হামিমকে জেরার পর শুক্রবার ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ থেকে অর্পিতাকে পাকড়াও করে এসটিএফ। শনিবার সকালে তাকে বর্ধমান আদালতে তুলে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
তদন্তে জানা গিয়েছে, শেহজাদ ভাট গ্রুপ ছাড়া ‘রানা’, ‘আবির’, ‘উজায়ের’, ‘জাঠ’ নামের আরও চার পাক হ্যান্ডেলারের সঙ্গে এদের যোগাযোগের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।

এক নজরে এই হাই-প্রোফাইল জঙ্গি কেস:
| বিষয় | তথ্য / বিবরণ |
| ধৃত অভিযুক্ত | হামিম মণ্ডল (হাওড়া/বর্ধমান) ও অর্পিতা সরকার (সাহেবগঞ্জ, ঝাড়খণ্ড) |
| তদন্তকারী সংস্থা | বেঙ্গল স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (Bengal STF) |
| জঙ্গি যোগাযোগ | পাকিস্তান-ভিত্তিক শেহজাদ ভাট গোষ্ঠী ও অন্যান্য হ্যান্ডলার |
| হিটলিস্টে থাকা ভিআইপি | মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, মন্ত্রী উমেশ রাইয়ের পুত্র |
| অভিযোগ | হানিট্র্যাপ, রেইকি, অপহরণের চক্রান্ত ও দেশবিরোধী কার্যকলাপ |
পশ্চিমবঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করে এই ধরনের পাক-মদতপুষ্ট হানিট্র্যাপ মডিউলের সক্রিয়তা রাজ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তবে এসটিএফের সময়োপযোগী পদক্ষেপে বড়সড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হলো। এই মডিউলের জাল কতটা গভীরে ছড়িয়ে রয়েছে এবং রাজ্যের আরও কোনো যুবসমাজ এতে যুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।






