Leopard Attack in Darjeeling: ক্ষিপ্ত চিতাবাঘের সঙ্গে ১ ঘণ্টার অসম লড়াই! নাতি ও পোষ্যের প্রাণ বাঁচিয়ে সাহসিকতার অনন্য নজির দার্জিলিংয়ের বৃদ্ধা দেবিকার

source : সংবাদ প্রতিদিন
পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে থাকা হিংস্র শ্বাপদের শক্তির কাছে মানুষের শরীরী শক্তি অত্যন্ত নগণ্য। কিন্তু সেই মানুষটি যদি হন একজন ঠাকুমা, আর বিপদে পড়া জীবটি যদি হয় তাঁর নিজের রক্তের নাতি—তবে সেই মাতৃশক্তি যে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে, তার সাক্ষী থাকল দার্জিলিং (Darjeeling)। ক্ষিপ্ত চিতাবাঘের নখ-দাঁতের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে এক ঘণ্টা লড়াই করলেন এক বৃদ্ধা। রক্তাক্ত হলেন, হাড় ভাঙল, তাও বাঘের মুখ থেকে নাতি আর পোষ্যকে কেড়ে নিয়ে তবেই শান্ত হলেন। দার্জিলিংয়ের দেবকোটা গ্রামের দেবিকা শেরপার এই অবিশ্বাস্য সাহসিকতার গল্প শুনে আজ থমকে গিয়েছে গোটা পাহাড়।
ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার সন্ধ্যায়, দার্জিলিংয়ের লোয়ার ভুটিয়া বস্তির দেবকোটা গ্রামে। পাহাড়ের কোলে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমানোর তোড়জোড় করছিলেন দেবিকা শেরপা। ঠিক সেই সময় ঘরের বাইরে আচমকাই হাজির হয় জঙ্গল থেকে লোকালয়ে চলে আসা একটি ক্ষিপ্ত চিতাবাঘ।
দুর্ভাগ্যবশত, দেবিকা দেবীর আট বছরের নাতি এবং তাঁদের প্রিয় পোষ্য কুকুরটি তখন বাড়ির বাইরেই ছিল। চোখের পলক ফেলার আগেই হিংস্র চারপেয়েটি গর্জন করে শিশু ও কুকুরটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নাতির আর্তনাদ শুনে ঘর থেকে বের হওয়া মাত্রই পরিস্থিতি টের পান দেবিকা দেবী। একটুও না ঘাবড়ে, কোনও অস্ত্রের কথা না ভেবে, খালি হাতেই চিতাবাঘের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি।
এরপর ভুটিয়া বস্তির ওই উঠোনে যা চলল, তা কোনও থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কম নয়। একপাশে দাঁত-নখ বের করা ক্ষুধার্ত চিতাবাঘ, অন্যপাশে নাতিকে বাঁচানোর জেদ নিয়ে এক বৃদ্ধার রণমূর্তি।
চিতাবাঘের একের পর এক থাবা এসে পড়ছিল দেবিকা দেবীর গায়ে। তাঁর একটি হাত ভেঙে যায়, অন্য হাত চিরে রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হতে থাকে। কামড় বসে মাথায়। কিন্তু যন্ত্রণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চিতাবাঘের গলা টিপে ধরে লড়াই চালিয়ে যান তিনি।
দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে এই অসম লড়াই চলার পর, বৃদ্ধার এমন রুদ্ররূপ ও মরণপণ প্রতিরোধের কাছে শেষমেশ হার মানে হিংস্র চিতাবাঘটি। বেগতিক বুঝে সে নাতি ও পোষ্যকে ছেড়ে দিয়ে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যায়।
চিতাবাঘটি পালিয়ে যাওয়ার পর প্রতিবেশীরা ছুটে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় দেবিকা শেরপাকে উদ্ধার করে দার্জিলিং জেলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল হলেও শরীরে একাধিক গভীর ক্ষত রয়েছে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন দেবিকা দেবী। বনদপ্তরের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন:
- আইনের বৈষম্য কেন?: “যদি কোনও মানুষ বন্যপ্রাণীকে আক্রমণ বা হত্যা করে, তবে বনদপ্তর তৎক্ষণাৎ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়, জেল-জরিমানা করে। তাহলে বন্যপ্রাণী যখন এইভাবে লোকালয়ে ঢুকে মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, তখন বনদপ্তর কেন ঘুমাচ্ছে?”
- চিতাবাঘটিকে ধরার আবেদন: ওই এলাকায় আরও শিশু রয়েছে। তাই হামলাকারী চিতাবাঘটিকে খাঁচাবন্দি করার জন্য বনদপ্তরের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, খবর পেয়ে বনদপ্তরের আধিকারিকেরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে বোঝা যাচ্ছে চিতাবাঘটি বর্তমানে অত্যন্ত ক্ষিপ্ত ও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। সেটিকে চিহ্নিত করে দ্রুত খাঁচা পাতার তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
দেবিকা শেরপা আজ শুধু তাঁর পরিবারের নয়, গোটা দার্জিলিংয়ের ‘সুপারওম্যান’। নিজের শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করেও যেভাবে তিনি নাতির জীবন ফিরে পেয়েছেন, তা মাতৃত্ব ও সাহসিকতার এক অনন্য দলিল হয়ে থাকবে। সোশাল মিডিয়ায় এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্যজুড়ে নেটিজেনরা এই বৃদ্ধাকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন। এখন দেখার, বনদপ্তর কত দ্রুত ওই ভুটিয়া বস্তির বাসিন্দাদের চিতাবাঘের আতঙ্ক থেকে মুক্তি দিতে পারে।






