Spogomi & Gomi Hiroi: হারের কান্না চেপেও স্টেডিয়াম সাফাই জাপানিদের! ‘স্পোগোমি’র বিশ্বজয়ের মাঝেও কেন উঠল ‘ডু ইট অ্যাট হোম’ স্লোগান?

source : সংবাদ প্রতিদিন
বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর মানেই গ্যালারিতে শুধু টানটান উত্তেজনা আর রঙের মেলা নয়, সেখানে এক অদ্ভুত সংস্কৃতির পাঠও দেয় সূর্যোদয়ের দেশ জাপান। ম্যাচ শেষ, রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর যখন অন্য দেশের সমর্থকরা মাঠ ছাড়েন, ঠিক তখনই গ্যালারিতে দেখা যায় এক চিরপরিচিত দৃশ্য। নীল জার্সি পরিহিত জাপানি সমর্থকেরা কান্না চেপে, হাতে প্লাস্টিকের বড় ব্যাগ নিয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছেন খালি জলের বোতল, কফির কাপ আর কাগজের টুকরো। এই সহজাত অভ্যাসই হলো ‘গোমি হিরোই’ (Gomi Hiroi)। কিন্তু বিশ্বকে চমকে দেওয়া এই সংস্কৃতির অন্দরেই এবার দানা বেঁধেছে এক পারিবারিক বিতর্ক।
জাপানি সংস্কৃতিতে পরিচ্ছন্নতা কেবল বাহ্যিক দেখানোর বিষয় নয়, এটি এক পরম আধ্যাত্মিক সংস্কার। ‘গোমি হিরোই’ শব্দটির ইংরেজি তর্জমা হলো ‘Picking up trash’ বা জঞ্জাল সাফ করা। ভারতের মতো দেশে যেখানে পরিচ্ছন্নতার সংজ্ঞা কেবল নিজের গৃহকোণটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং নিজের আবর্জনা প্রতিবেশীর জমিতে ফেলতে আমরা দ্বিধা করি না, সেখানে জাপানিরা একদম উল্টো।
চলতি বিশ্বকাপে প্রবল পরাক্রম দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে জাপানকে। শেষ চারে ওঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে গিয়েছে। কিন্তু সেই তীব্র মনকষ্টের মধ্যেও কর্তব্যে এক চুল চ্যুতি ঘটেনি তাঁদের। ম্যাচ শেষে গ্যালারির প্রতিটি কোণ পরম মমতায় পরিষ্কার করেছেন সমর্থকেরা।
পরিচ্ছন্নতার এই অভ্যাসকে স্রেফ সমাজসেবায় আটকে না রেখে, জাপানিরা একে স্পোর্টস বা খেলার রূপ দিয়েছেন। শব্দটি এসেছে ‘স্পোর্ট গোমি হিরোই’ থেকে, সংক্ষেপে যাকে বলা হয় ‘স্পোগোমি’ (Spogomi)। ২০০৮ সালে জাপানে এই খেলার প্রবর্তন হয়, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট এলাকার জঞ্জাল নিখুঁতভাবে সাফাই করতে হয়।
- ২০২৩ সালের প্রথম স্পোগোমি বিশ্বকাপ: চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল গ্রেট ব্রিটেন।
- ২০২৫ সালের দ্বিতীয় স্পোগোমি বিশ্বকাপ: রানার্স আপ জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের খেতাব ছিনিয়ে নেয় স্বাগতিক দেশ জাপান।
বিশ্বমঞ্চে জাপানি পুরুষদের এই পরিচ্ছন্নতার ছবি তুমুল প্রশংসিত হলেও, এবারের বিশ্বকাপ চলাকালীন সোশাল মিডিয়ায় একটি ব্যঙ্গচিত্র (Sketch) মারাত্মক ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, একজন জাপানি যুবক স্টেডিয়ামের গ্যালারি সাফসুতরো করতে জান লড়িয়ে দিচ্ছে, অথচ পরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে সেই যুবকটিই নিজের বাড়িতে সোফায় অলসভাবে পা তুলে বসে রয়েছে আর তার স্ত্রী একহাতে রান্নাঘর ও ঘরের জঞ্জাল পরিষ্কার করছেন।
জাপানের সমাজব্যবস্থায় গৃহস্থালির কাজের ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্যের এক চরম রূপ সামনে এসেছে:
| লিঙ্গ | দৈনিক গৃহস্থালি ও সাফাইয়ের গড় সময় (Unpaid Labor) |
| জাপানি মহিলা / স্ত্রী | প্রায় ৩ ঘণ্টা (১৮০ মিনিট) |
| জাপানি পুরুষ / স্বামী | মাত্র ৪৭ মিনিট |
এই বিশাল ফারাক বা বৈষম্যের কারণেই ক্ষুব্ধ জাপানি মেয়েরা এবার বিশ্বমঞ্চে আওয়াজ তুলেছেন—‘ডু ইট অ্যাট হোম টু’ (Do it at home too)। অর্থাৎ, কেবল ক্যামেরার সামনে বা স্টেডিয়ামে গিয়ে বিশ্ববাসীকে চমকে দেওয়ার জন্য সাফাই করলে হবে না, বাড়ির অন্দরে স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে ঘর ও রান্নাঘর পরিষ্কারেও সমানভাবে মনোযোগী হতে হবে পুরুষদের।
জাপানিদের ‘গোমি হিরোই’ কিংবা ‘স্পোগোমি’ নিঃসন্দেহে পরিবেশ সচেতনতার এক বৈপ্লবিক উদাহরণ। কিন্তু কোনও সমাজ তখনই নিখুঁত হতে পারে, যখন তার বাইরের তকতকে রূপটা ঘরের অন্দরের বৈষম্যকেও মুছে দিতে পারে। জাপানি পুরুষরা স্টেডিয়াম সাফ করার পাশাপাশি কবে ঘরের অন্দরেও সমানভাবে হাত লাগাবেন, এখন সেই পরিবর্তনের অপেক্ষাতেই সে দেশের নারী সমাজ।






