Cristiano Ronaldo World Cup Journey: চোখ টিপে শুরু, চোখের জলে শেষ! ২০০৬-এর রুনি বিতর্ক থেকে ২০২৬-এর স্পেন ম্যাচ, রোনাল্ডোর ২০ বছরের ট্র্যাজিক রূপকথা

source : সংবাদ প্রতিদিন
কুড়ি বছর। একটা গোটা প্রজন্ম বড় হয়ে গিয়েছে সিআর সেভেন (CR7) নামক এক মহীরুহকে আশ্রয় করে। ফুটবল দেবতা তাঁকে দু’হাত উজাড় করে রেকর্ড দিয়েছেন, দিয়েছেন কোটি কোটি ভক্তের ভালোবাসা ও ফুটবল সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র রাজত্ব। কিন্তু যে ট্রফিটার জন্য তিনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে রক্ত-ঘাম এক করেছিলেন, সেই সোনার বিশ্বকাপটা আর ছোঁয়া হলো না ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর (Cristiano Ronaldo)। ২০ বছর আগে যে রূপকথা শুরু হয়েছিল এক উদ্ধত তরুণের ‘চোখ মারা’ দিয়ে, দুই দশক পর ডালাসের সবুজ গালিচায় তা শেষ হলো এক মহাতারকার ‘চোখের জলে’।
২০০৬ সাল: রুনির লাল কার্ড এবং সেই ঐতিহাসিক ‘চোখ টেপা’
সালটা ২০০৬, জার্মানি বিশ্বকাপ। ২১ বছরের এক পর্তুগিজ তরুণ উইঙ্গার প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে নিজের জাদু দেখাচ্ছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি রোনাল্ডোর জন্মভূমি পর্তুগাল এবং তাঁর কর্মভূমি ইংল্যান্ড (যে দেশের ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে তখন খেলছেন সিআর৭)। ম্যাচের ৬২ মিনিটে রোনাল্ডোর ক্লাব সতীর্থ ওয়েইন রুনির (Wayne Rooney) পা জড়িয়ে যায় এক পর্তুগিজ ফুটবলারের সাথে।
তরুণ রোনাল্ডো সটান ছুটে যান রেফারির কাছে, রুনির লাল কার্ডের জোরালো আবেদন জানান। ক্লাব সতীর্থের এই আচরণে রুনি ধাক্কা মারেন রোনাল্ডোকে এবং রেফারি রুনিতে লাল কার্ড দেখান। রুনি যখন মাঠ ছাড়ছেন, ঠিক তখনই ব্রিটিশ মিডিয়ার ক্যামেরায় ধরা পড়ে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য— পর্তুগাল বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে ডান চোখটি টিপে দিলেন মিচকে তরুণ রোনাল্ডো! যেন বার্তা দিলেন— ‘কেমন দিলাম!’
ম্যাচটি ইংল্যান্ড হেরে যাওয়ার পর ব্রিটিশ মিডিয়া রোনাল্ডোকে ‘গদ্দার’ তকমা দেয়, ৩ বছর ইংল্যান্ডে ঢোকা নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। যদিও পরে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের ড্রেসিংরুমে রুনির সাথে নিজেই সব মিটমাট করে নিয়েছিলেন রোনাল্ডো।
২০২২ সাল: কোচের ওপর রাগ, অপমান এবং মরক্কো ট্র্যাজেডি
১৬ বছর পর, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেই মিচকে তরুণই পরিণত হয়েছিলেন বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে কাতারেই তাঁকে সহ্য করতে হয় জীবনের সবচেয়ে বড় অপমান। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ চলাকালীন তৎকালীন কোচ ফের্নান্দো স্যান্তোস (Fernando Santos) তাঁকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন। দেশের ইতিহাসের সেরা ফুটবলারকে এভাবে তুলে নেওয়া মেনে নিতে পারেননি সিআর৭। রাগে গজগজ করতে করতে মাঠ ছাড়েন তিনি।
শাস্তিস্বরূপ নক-আউট পর্বে পর্তুগালের প্রথম একাদশ থেকে ছেঁটে ফেলে সটান বেঞ্চে বসিয়ে দেওয়া হয় রোনাল্ডোকে। কোয়ার্টার ফাইনালে ১০ জনের মরক্কোর কাছে যখন পর্তুগাল ১-০ গোলে হেরে ছিটকে যায়, তখন বিশ্ব দেখেছিল এক ভাঙা রাজপুত্রের কান্না। মাঠ থেকে একা একা টানেল দিয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে রোনাল্ডোর বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য আজও ফুটবলপ্রেমীদের বুকে শেল বিঁধিয়ে দেয়।
[বিশ্বকাপে সিআর সেভেনের অমর খতিয়ান]
* ২০০৬ (জার্মানি): প্রথম বিশ্বকাপ, সেমিফাইনালে প্রবেশ, রুনির সাথে ঐতিহাসিক চোখ-টেপা বিতর্ক।
* ২০২২ (কাতার): টানা ৫টি বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড, মরক্কোর কাছে হেরে কোয়ার্টারে কান্না।
* ২০২৬ (আমেরিকা): টানা ৬টি বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র মানব, বয়স্কতম প্লেয়ার হিসেবে নক-আউটে খেলার রেকর্ড, স্পেনের কাছে হেরে ট্র্যাজিক বিদায়।
২০২৬ সাল: ফুটবল দেবতা এবারও বিমুখ করলেন তাঁর একনিষ্ঠ পূজারীকে
বয়স ৪০ পেরিয়ে ৪১-এ ঠেকেছিল। তাও নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে শেষবারের মতো বিশ্বকাপের ময়দানে নেমেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। এই টুর্নামেন্টেও নক-আউটে গোল করে সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার হিসেবে গোল করার বিশ্বরেকর্ড নিজের নামে করেন তিনি। কিন্তু ফুটবল দেবতা হয়তো তাঁর স্ক্রিপ্টটা অন্যভাবে লিখেছিলেন।
স্পেনের বিরুদ্ধে শেষ ১৬-র হাইভোল্টেজ ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে মিকেল মেরিনোর গোলে পর্তুগালের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। রেফারি অ্যান্টনি টেলরের শেষ বাঁশি বাজতেই ডালাসের মাঠে আরও একবার ভিজল রোনাল্ডোর চোখের কোণ। আর কোনোদিন বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজ জার্সিতে নামা হবে না তাঁর— এই কঠিন সত্যটা মেনে নিয়েই মাঠ ছাড়লেন সিআর সেভেন।
এক নজরে ২০ বছরের রোনাল্ডো-মহাকাব্য:
| বিশ্বকাপের সাল | দলের সর্বোচ্চ সাফল্য | রোনাল্ডোর ব্যক্তিগত স্থিতি ও মুহূর্ত |
| ২০০৬ | চতুর্থ স্থান (সেমিফাইনাল) | রুনির লাল কার্ড ও বেঞ্চে তাকিয়ে চোখ মারা। |
| ২০১০ & ২০১৪ | শেষ ১৬ ও গ্রুপ পর্ব বিদায় | দলের একক কাণ্ডারি হিসেবে লড়াই। |
| ২০১৮ | শেষ ১৬ বিদায় | স্পেনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক। |
| ২০২২ | কোয়ার্টার ফাইনাল বিদায় | কোচের সাথে বিবাদ, বেঞ্চে বসা ও টানেলে কান্না। |
| ২০২৬ | নক-আউট পর্ব বিদায় | টানা ৬টি বিশ্বকাপে গোলের বিশ্বরেকর্ড এবং চোখের জলে শেষ বিদায়। |
বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা হয়তো ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ট্রফি ক্যাবিনেটে কোনোদিন শোভা পাবে না। কিন্তু ট্রফি না পেয়েও তিনি পর্তুগালকে বিশ্বমঞ্চে সেয়ানে-সেয়ানে লড়াই করার যে মানসিকতা শিখিয়ে গেলেন, তা কোনো সোনার কাপের চেয়ে কম নয়। ২০০৬-এর সেই ঔদ্ধত্য ভরা ‘চোখ মারা’ দিয়ে যে বিশ্বজয়ের অভিযান শুরু হয়েছিল, ২০২৬-এ তা শেষ হলো এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর ‘চোখের জলে’। ট্রফি না জিতলেও, বিশ্বমঞ্চে রোনাল্ডো নামের গল্পগাথা চিরকাল অমর থাকবে।






