Baruipur Case Accused Encounter: “আমার শান্তি হয়েছে, দেহ আনব না!” বারুইপুর কাণ্ডে ধৃত প্রভাসের এনকাউন্টারে নিজের কোল খালি হওয়ায় আফসোস নেই পরিচারিকা মায়ের

source : এইসময় অনলাইন
সমাজ ও অপরাধের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল, যেখানে কোনো সন্তানের এনকাউন্টারে মৃত্যুর পর তার জন্মদাত্রী মা কান্নায় ভেঙে পড়ার বদলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। উত্তর ২৪ পরগনার বারুইপুরে (Baruipur) ১১ বছরের এক নাবালিকাকে গণধর্ষণ ও নৃশংসভাবে পিটিয়ে-জলে ডুবিয়ে হত্যার ঘটনায় ধৃত মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল (Prabhas Mondal) পুলিশের পাল্টা গুলিতে খতম হয়েছে। আর এই পরিণতির জন্য নিজের ছেলেকেই সম্পূর্ণ দায়ী করলেন মা সন্ধ্যা মণ্ডল। বুধবার ভোরে পুলিশ যখন বাড়িতে এসে ছেলের মৃত্যুসংবাদ দেয়, তখন চোখের জল ফেলার বদলে মা সন্ধ্যা দেবী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, “ও যা করেছে, ওর যে মৃত্যু হয়ে গিয়েছে, এতে আমার শান্তি।”
“মায়ের তো কষ্ট হবেই, কিন্তু ও যা কর্ম করেছে…”— ভেঙে পড়েননি মা
কলকাতায় একটি বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালান সন্ধ্যা মণ্ডল। অত্যন্ত খেটে খাওয়া এবং নীতিপরায়ণ এই পরিবারে প্রভাস ছিল এক বড় অভিশাপ। মা বার বার নিষেধ করলেও প্রভাস কোনো কথা শুনত না, উল্টো দিনরাত নেশায় বুঁদ হয়ে থাকত।
বুধবার ভোরে যখন বারুইপুর থানার পুলিশ কর্মীরা প্রভাসের বাড়িতে গিয়ে তার মৃত্যুর খবর জানান এবং দেহ সনাক্ত করতে হাসপাতালে যেতে বলেন, তখন সন্ধ্যা দেবী স্পষ্ট জানান—
“পুলিশ এসে বলল, আপনার ছেলে মারা গিয়েছে। হাসপাতালে আছে, দেখতে চান? আমি বললাম, আর দেখতে চাই না। দেখে কী করব? আমার আর যাওয়ার শক্তি নেই, আমি যাব না। মায়ের তো কষ্ট হবেই। কিন্তু ও যা কর্ম করেছে, তাতেই গিয়েছে। ও আমাদের কথা শোনেনি, মায়ের কথা শোনেনি, নেশা করত। মৃতদেহ আমি আনব না। ওকে নিয়ে পুলিশ যা খুশি করুক।”
“অন্য মায়ের কোল খালি করেছে, আমার কোল খালি হলেও দুঃখ নেই”
বারুইপুরের ১১ বছরের ওই একরত্তি মেয়েটিকে যেভাবে গণধর্ষণের পর গলায় পা দিয়ে চেপে, পুকুরের জলে ছুঁড়ে ফেলে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল, তা জানার পর থেকেই খোদ প্রভাসের মা ছেলের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে আসছিলেন।
তদন্তের শুরুর দিনগুলোতেই সন্ধ্যা দেবী পুলিশের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “ওকে ফাঁসি দিন, বা কেটে ফেলে দিন… ও যা করেছে, তার শাস্তি দিন।” তিনি অত্যন্ত খেদের সুরে জানিয়েছিলেন, তাঁর ছেলে যখন অন্য এক নিরপরাধ মায়ের কোল খালি করে দিতে পেরেছে, তখন আজ অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাঁর নিজের কোল খালি হলেও তাঁর মনে কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ থাকবে না। বুধবারের এনকাউন্টার যেন মায়ের সেই কথাই সত্যি প্রমাণ করল।
[বারুইপুর কাণ্ডের নৃশংসতা ও এনকাউন্টার টাইমলাইন]
* অপরাধের ধরণ: ১১ বছরের নাবালিকাকে গণধর্ষণ, গলায় পা দিয়ে চেপে পুকুরের জলে ফেলে নৃশংস খুন।
* অভিযুক্তের ভূমিকা: প্রভাস মণ্ডল এই জঘন্যতম অপরাধের অন্যতম প্রধান ব্লু-প্রিন্টার।
* মঙ্গলবার রাত ১২:৪৫: বারুইপুরের সূর্যপুরে অকুস্থলে ঘটনার পুনর্নির্মাণের (Reconstruction) জন্য প্রভাসকে নিয়ে যায় পুলিশ।
* পালানোর চেষ্টা: পুনর্নির্মাণ শুরুর ঠিক আগে এক পুলিশ কর্মীর বন্দুক ছিনিয়ে এক রাউন্ড গুলি চালায় প্রভাস।
* পাল্টা অ্যাকশন: আত্মরক্ষার্থে পুলিশের পাল্টা গুলি, বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেলে প্রভাসকে মৃত ঘোষণা।
কীভাবে হলো এই গভীর রাতের এনকাউন্টার?
পুলিশি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১২টা ৪৫ মিনিট নাগাদ বারুইপুর থানার তদন্তকারী অফিসার এবং তাঁর বিশেষ টিম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে সাথে নিয়ে বারুইপুরের সূর্যপুরের সেই অকুস্থলে যান, যেখানে নাবালিকার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল ঘটনার পুনর্নির্মাণ বা ক্রাইম সিনের সত্যতা যাচাই করা।
কিন্তু অকুস্থলে পৌঁছানো মাত্রই পুলিশের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে আচমকাই এক পুলিশ কর্মীর সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেয় প্রভাস। সে পুলিশ টিমকে লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে এবং অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালানোর চেষ্টা করে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে এবং আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায় পুলিশও। পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত অবস্থায় প্রভাসকে উদ্ধার করে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এক নজরে বারুইপুর এনকাউন্টার ও মায়ের প্রতিক্রিয়া:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | পুলিশি অ্যাকশন ও মায়ের অবস্থান |
| নিহত অপরাধী | প্রভাস মণ্ডল (নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত)। |
| মায়ের নাম | সন্ধ্যা মণ্ডল (কলকাতার পরিচারিকা)। |
| ছেলের প্রতি মায়ের ক্ষোভ | কথা না শোনা, মাত্রাতিরিক্ত নেশা করা এবং জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হওয়া। |
| পুলিশের এনকাউন্টারের কারণ | তদন্ত চলাকালীন পুলিশ কর্মীদের ওপর গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা। |
| পরিবারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত | মা সন্ধ্যা দেবী সাফ জানিয়েছেন তিনি ছেলের কুৎসিত মুখ আর দেখতে চান না, দেহও আনবেন না। |
বারুইপুরের এই এনকাউন্টারের ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি এনে দেওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় সমাজব্যবস্থার এক অত্যন্ত কঠিন কিন্তু সৎ রূপ তুলে ধরেছে। একজন পরিচারিকা মা, যিনি শত কষ্টের মধ্যেও নিজের অপরাধী ছেলেকে আড়াল করার চেষ্টা করেননি, বরং তার মৃত্যুকে ‘শান্তি’ বলে উল্লেখ করেছেন— তা সত্যিই নজিরবিহীন। প্রভাস মণ্ডলের এই পরিণতি প্রমাণ করে যে, অপরাধের পথ শেষ পর্যন্ত কতটা অন্ধকার এবং নিজের কৃতকর্মের ফল এই জন্মেই ভোগ করতে হয়।






