Baruipur Encounter Case: শুভেন্দুর সেই ‘বিকেলে খরচ’ হুঁশিয়ারির আবহেই বারুইপুরে এনকাউন্টার! প্রভাসকে খতম করা দুই ‘দাবাং’ অফিসার অর্ঘ্য ও রনির অপারেশন খতিয়ান

source : সংবাদ প্রতিদিন
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল জমানায় ঘটে যাওয়া একাধিক নারী নির্যাতনের ঘটনায় অতীতে বারবার কাঠগড়ায় উঠেছে পুলিশ ও শাসকদলের ভূমিকা। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাব বা আইনি জটিলতার সুযোগ নিয়ে দোষীরা পার পেয়ে গিয়েছে। এই আবহেই গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এক বিস্ফোরক হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, “বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় এলে ধর্ষকদের কোর্টে পাঠাব না, সকালে জমা নেব, বিকেলে খরচ করব।”
বিজেপি ক্ষমতায় না এলেও, বারুইপুরের ১১ বছরের নাবালিকাকে গণধর্ষণ ও নৃশংস খুনের মামলায় গ্রেপ্তারির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই যোগীরাজ্যের ধাঁচে ‘বিকেলে খরচ’ বা এনকাউন্টারের সাক্ষী থাকল বাংলা। আর এই রুদ্ধশ্বাস ও হাই-প্রোফাইল অপারেশনের নেপথ্যে রয়েছেন রাজ্য পুলিশের দুই ‘দাবাং’ অফিসার।
মঙ্গলবার গভীর রাতে সূর্যপুরে ঠিক কী ঘটেছিল?
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার দিনভর বারুইপুর কাণ্ডে ধৃতদের দফায় দফায় জেরা করেন বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট (SIT)-এর সদস্যরা। এরপর রাতে ঘড়ির কাঁটায় যখন পৌনে ১টা, তখন মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে নিয়ে বারুইপুরের সূর্যপুরের সেই নির্জন অকুস্থলে যান তদন্তকারীরা। নিয়ম অনুযায়ী, জেরায় অভিযুক্ত যা স্বীকার করেছে, তার সত্যতা মেলাতে ক্রাইম সিনের পুনর্নির্মাণ (Crime Scene Reconstruction) করা হচ্ছিল।
ঠিক তখনই ঘটে সেই নাটকীয় মোড়। পুনর্নির্মাণ শুরু হওয়ার মুহূর্তেই পুলিশের নজরদারিতে থাকা প্রভাস আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে সিটের অন্যতম সদস্য রনি সরকারের ওপর। নিমেষের মধ্যে রনি সরকারের কোমরে থাকা সার্ভিস পিস্তলটি ছিনিয়ে নেয় সে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশকে লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করে প্রভাস। ঠিক এই চরম বিপদের মুহূর্তেই নিজের বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালান পাশে থাকা অপর অফিসার অর্ঘ্য মণ্ডল। অর্ঘ্য বাবুর ছোঁড়া গুলিতেই অকুস্থলে লুটিয়ে পড়ে কুখ্যাত অপরাধী প্রভাস মণ্ডল।
কারা এই দুই ‘দাবাং’ অফিসার? চিনে নিন অর্ঘ্য ও রনি-কে
বারুইপুর এনকাউন্টারের নেপথ্যে থাকা এই দুই পুলিশ অফিসারের ট্র্যাক রেকর্ড কিন্তু অত্যন্ত ঈর্ষণীয়। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকার অপরাধ দমনে এঁরা দুজনেই অত্যন্ত পরিচিত নাম।
- অর্ঘ্য মণ্ডল (SI, বারুইপুর গুন্ডাদমন শাখা): অর্ঘ্য বাবু ২০১৪ সালের ব্যাচের একজন অত্যন্ত দক্ষ অফিসার। বর্তমানে তিনি বারুইপুর থানার গুন্ডাদমন শাখার (Anti-Rowdy Squad) দায়িত্বে রয়েছেন। এর আগে সোনারপুর, কুলতলি ও জয়নগর থানায় কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এছাড়া বারুইপুর এসওজি (SOG)-র ইনচার্জ হিসেবেও তিনি একাধিক বড় অপরাধের জট খুলেছেন।
- রনি সরকার (SI, ক্যানিং গুন্ডাদমন শাখা): রনি সরকারের পুলিশি কেরিয়ারের লড়াইটা আরও অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি কেরিয়ার শুরু করেছিলেন একজন সাধারণ কনস্টেবল হিসেবে। পরবর্তীতে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার জোরে পদোন্নতি পেয়ে সাব-ইন্সপেক্টর (SI) হন। বর্তমানে তিনি ক্যানিং থানার গুন্ডাদমন শাখার দায়িত্বে রয়েছেন। এর আগে নরেন্দ্রপুর, বারুইপুর, জয়নগর ও বকুলতলার মতো অপরাধপ্রবণ এলাকায় সুনামের সাথে কাজ করেছেন তিনি।
[বারুইপুর এনকাউন্টার: দুই বীর অফিসারের প্রোফাইল]
১. অর্ঘ্য মণ্ডল -> ২০১৪ ব্যাচের অফিসার | বর্তমান: বারুইপুর গুন্ডাদমন শাখা প্রধান | ভূমিকা: আত্মরক্ষার্থে প্রভাসকে লক্ষ্য করে গুলি চালান।
২. রনি সরকার -> প্রাক্তন কনস্টেবল, বর্তমান এসআই | বর্তমান: ক্যানিং গুন্ডাদমন শাখা | ভূমিকা: যার কোমর থেকে পিস্তল ছিনিয়ে নিয়েছিল প্রভাস।
মুখ্যমন্ত্রীর গঠিত ‘সিট’-এর তুরুপের তাস ছিলেন এরাই
বারুইপুরের নাবালিকা মৃত্যুর ঘটনাটি যেভাবে রাজ্য রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই মামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য রাজ্য পুলিশের সেরা অফিসারদের নিয়ে একটি ‘সিট’ (SIT) গঠন করার নির্দেশ দেন। আর সেই সিট গঠনের সময়ই ওপর মহল থেকে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা হয়েছিল অর্ঘ্য মণ্ডল এবং রনি সরকারের ওপর। মঙ্গলবার রাতের ঘটনা প্রমাণ করে দিল, এই দুই অফিসারকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক ছিল।
এক নজরে সূর্যপুরের এনকাউন্টার অপারেশন:
| অপারেশনের ক্ষেত্র | বিবরণ ও আধিকারিকদের তথ্য |
| অপারেশনের সময় | মঙ্গলবার গভীর রাত, আনুমানিক ১২:৪৫ মিনিট। |
| অপারেশনের স্থান | সূর্যপুর, বারুইপুর (অকুস্থল)। |
| অস্ত্র ছিনতাইয়ের শিকার | এসআই রনি সরকার (ক্যানিং গুন্ডাদমন শাখা)। |
| পাল্টা গুলি চালনাকারী | এসআই অর্ঘ্য মণ্ডল (বারুইপুর গুন্ডাদমন শাখা, ২০১৪ ব্যাচ)। |
| তদন্তকারী দল | রাজ্য পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ (SIT)। |
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা এনকাউন্টার নিয়ে মানবাধিকার মহলে হাজারো প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু বারুইপুরের সাধারণ মানুষের কাছে এই দুই পুলিশ অফিসার এখন ‘রিয়েল লাইফ হিরো’। যেভাবে তাঁরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক জঘন্যতম ধর্ষক ও খুনিকে রুখে দিয়েছেন, তা খোদ প্রশাসনের অন্দরেও প্রশংসিত হচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারীর সেই “বিকেলে খরচ” করার রাজনৈতিক তত্ত্বের সাথে এর মিল থাকুক আর নাই থাকুক, বাংলার পুলিশ যে অপরাধীদের রেয়াত করার মুডে নেই, তা অর্ঘ্য এবং রনি স্পষ্ট করে দিলেন।






