Bengal Scheme Scam: পুরুষদের অ্যাকাউন্টে ঢুকছে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর টাকা! কাটোয়ায় ধৃত তৃণমূল নেতা বাবলু, আদালতে তোলার পথে ডিম হামলা আর এক ধৃত সেলিমকে

source :sangbad pratidin
রাজ্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির টাকা সরাসরি উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে (DBT) যাওয়ার নিয়ম থাকলেও, খোদ শাসক দলের নেতাদের যোগসাজশে সেখানেও থাবা বসাল জালিয়াতরা। পুরুষদের অ্যাকাউন্টে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা ঢুকিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠল পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ায়। এই চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির অভিযোগে পুলিশ এক তৃণমূল নেতাকে গ্রেফতার করেছে। একই দিনে বর্ধমানে তোলাবাজি ও হিংসার অভিযোগে ধৃত আর এক প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলরকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার পথে ডিম হামলার মুখে পড়তে হলো, যা নিয়ে শুক্রবার দিনভর চরম উত্তপ্ত রইল বর্ধমান জেলা আদালত চত্বর।
পুরুষদের অ্যাকাউন্টে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, জমিহীনদের ‘কৃষক বন্ধু’!
কাটোয়া-১ ব্লকের আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা দীনেশ অধিকারী কয়েকদিন আগে কাটোয়া থানায় একটি বিস্ফোরক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, আলমপুর পঞ্চায়েতের তৃণমূল নেতা মোল্লা নজরুল ইসলাম ওরফে বাবলু মোল্লা নিজের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং বিডিও অফিসের ভেতরের লোকের সাহায্যে সরকারি টাকা লুঠ করছেন।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে বাপ্পা মণ্ডল, সুখেন মণ্ডল, কুশল ঘোষ, নীলরতন ঘোষ-সহ এলাকার বেশ কিছু পুরুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের টাকা নিয়মিত পাঠানো হচ্ছিল। শুধু তাই নয়, রিনা মণ্ডল, চিন্তাময়ী মণ্ডল, নমিতা মণ্ডল-সহ এমন বহু ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের টাকা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাদের নামে বাস্তবে কোনো চাষের জমিই নেই। পরবর্তীতে সেই টাকা ওই অ্যাকাউন্টধারীদের থেকে তুলে আত্মসাৎ করতেন বাবলু মোল্লা।
বিডিও অফিসের অপারেটর পলাতক, ধৃত বাবলু পুলিশ হেফাজতে
পুলিশ জানিয়েছে, এই জালিয়াতি সাধারণ কোনো ডেটা এন্ট্রির ভুল নয়। এর পিছনে কাজ করেছে সরকারি পোর্টাল হ্যাকিং বা নথির জালিয়াতি। অভিযোগ, কাটোয়া-১ বিডিও (BDO) অফিসের ডিপিপি অপারেটর কার্তিক মণ্ডল সরকারি সিস্টেমে ঢুকে এই পুরুষদের নাম ও ভুয়া তথ্য আপলোড করতে বাবলুকে সরাসরি সাহায্য করেছিল।
বর্তমানে অভিযুক্ত সরকারি কর্মী কার্তিক মণ্ডল পলাতক, তার খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। অন্যদিকে, পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পেয়ে বৃহস্পতিবার রাতেই বাবলু মোল্লাকে গ্রেফতার করে। শুক্রবার তাঁকে কাটোয়া মহকুমা আদালতে পেশ করা হলে বিচারক এই আন্তঃজেলা চক্রের শিকড়ে পৌঁছাতে ধৃতকে ৫ দিনের পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন।
[পূর্ব বর্ধমান জোড়া কেলেঙ্কারি ডায়েরি]
১. কাটোয়া জালিয়াতি: পুরুষদের নামে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এবং জমিহীনদের নামে কৃষক বন্ধুর টাকা আত্মসাৎ।
* ধৃত: মোল্লা নজরুল ইসলাম (বাবলু মোল্লা)।
* পলাতক: কার্তিক মণ্ডল (বিডিও অফিস অপারেটর)।
২. বর্ধমান তোলাবাজি মামলা: তোলাবাজি, ভোটপরবর্তী হিংসা ও হুমকি।
* ধৃত: সৈয়দ মহম্মদ সেলিম (প্রাক্তন আইএনটিটিইউসি জেলা সভাপতি)।
* জনরোষ: বর্ধমান আদালতে পেশের সময় মাথায় ডিম ভেঙে বিক্ষোভ।
আদালতে তোলার পথে আইএনটিটিইউসি নেতা সেলিমের মাথায় ফাটল ডিম!
কাটোয়ার এই সরকারি প্রকল্প চুরির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই, বর্ধমান শহরের পরিস্থিতি আরও নাটকীয় রূপ নেয়। তোলাবাজি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে হুমকি এবং ভোটপরবর্তী হিংসার একাধিক পুরনো মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে বৃহস্পতিবার রাতে বর্ধমান থানার পুলিশ গ্রেফতার করে বর্ধমান পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর তথা আইএনটিটিইউসি (INTTUC)-র পূর্ব বর্ধমান জেলার প্রাক্তন সভাপতি সৈয়দ মহম্মদ সেলিমকে।
শুক্রবার দুপুরে সেলিমকে যখন কড়া পুলিশি পাহারায় বর্ধমান জেলা আদালতে পেশ করার জন্য গাড়ি থেকে নামানো হচ্ছিল, ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে ধেয়ে আসে ডিম। ‘চোর চোর’ স্লোগানের মাঝে বিক্ষোভকারীদের ছোড়া একটি ডিম সরাসরি এসে ফাটে প্রাক্তন কাউন্সিলর সেলিমের মাথায়। ডিমের কুসুম ও সাদা অংশ তাঁর মাথা বেয়ে চোখে-মুখে নেমে আসে। পুলিশ তড়িঘড়ি তাঁকে জড়িয়ে ধরে এজলাসের ভেতরে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় আদালত চত্বরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায়।
এক নজরে কাটোয়া ও বর্ধমানের জোড়া দুর্নীতি মামলা:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | কাটোয়া স্ক্যাম ও বর্ধমান গ্রেফতারির আপডেট |
| মূল অভিযোগ (কাটোয়া) | পুরুষদের অ্যাকাউন্টে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও ভুয়া কৃষক বন্ধুর টাকা আত্মসাৎ। |
| মূল অভিযুক্ত (কাটোয়া) | তৃণমূলের বাবলু মোল্লা (৫ দিনের পুলিশ রিমান্ড)। |
| সরকারি যোগসাজশ | কাটোয়া-১ বিডিও অফিসের অপারেটর কার্তিক মণ্ডল (পলাতক)। |
| অন্যান্য গ্রেফতারি (বর্ধমান) | তোলাবাজি ও হিংসার অভিযোগে ধৃত প্রাক্তন কাউন্সিলর সৈয়দ মহম্মদ সেলিম। |
| আদালতের জনরোষ | সেলিমকে লক্ষ্য করে ডিম বর্ষণ ও তীব্র চোর চোর স্লোগান। |
লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা মহিলাদের স্বনির্ভর করার জন্য দেওয়া হলেও, তা কীভাবে পুরুষদের অ্যাকাউন্টে চলে গেল এবং বিডিও অফিসের কর্মীরা কীভাবে এই ভেরিফিকেশন পাস করাল, তা নিয়ে নবান্নের অন্দরেও উষ্মা তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, তৃণমূলের নিচু তলার নেতাদের প্রশ্রয়েই সরকারি প্রকল্পের টাকা এভাবে নয়ছয় হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, কাটোয়া বিডিও অফিসের আরও বেশ কিছু কর্মী এবং ব্যাঙ্কের কিছু আধিকারিক এই চক্রের স্ক্যানারে রয়েছেন। অন্যদিকে, আদালতে তৃণমূল নেতার ওপর এই ডিম হামলার ঘটনা প্রমাণ করছে যে, তোলাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন কতটা চরম সীমায় পৌঁছেছে।






