Colombia Football Terror 2026: বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যেতেই খুনের হুমকি মিডফিল্ডার কাম্পাজকে! ফিরে এল আন্দ্রে এস্কোবারের ৩২ বছর পুরনো রক্তাক্ত স্মৃতি, দেশে ফিরতে আতঙ্কিত ২৬ বছরের তারকা

source : সংবাদ প্রতিদিন
ফুটবলকে বলা হয় সুন্দর খেলা (The Beautiful Game), কিন্তু কলম্বিয়ার উগ্র ফুটবল সমর্থকদের কাছে তা যেন জীবন-মরণের এক আদিম খেলা। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে কলম্বিয়া বেরিয়া যাওয়ার পরেই ফের একবার প্রকাশ পেল লাতিন ফুটবলের অন্ধকার ও কুৎসিত দিকটি। সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে দল বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পরেই দলের নির্ভরযোগ্য ২৬ বছর বয়সি মিডফিল্ডার জামিন্টন কাম্পাজকে (Jaminton Campaz) গণহারে খুনের হুমকি দেওয়া শুরু হয়েছে। আর এই ঘটনা ৩২ বছর আগেকার এক মর্মান্তিক ও রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মৃতি উসকে দিয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের অন্দরে।
টাইব্রেকারে গোল করেও ভিলেন কাম্পাজ! অদ্ভুত যুক্তি সমর্থকদের
২০২৬ বিশ্বকাপের মেগা আসরে রাউন্ড অফ ১৬-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়া। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়েও দুই দলের কেউই গোল করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে বা টাইব্রেকারে। সেখানে কলম্বিয়ার দুই ফুটবলার পেনাল্টি মিস করায় ৪-৩ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে যায় সুইজারল্যান্ড।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, টাইব্রেকারে কাম্পাজ কিন্তু কোনো ভুল করেননি, তিনি নিখুঁতভাবে গোল করেছিলেন। তা সত্ত্বেও সমস্ত ক্ষোভ ও আক্রোশের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন তিনি। কারণ, ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে কলম্বিয়ার সামনে একটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ এসেছিল, যা অত্যন্ত সহজ হওয়া সত্ত্বেও মিস করেন কাম্পাজ। কলম্বিয়ার উগ্র সমর্থকদের একাংশের মতে, ওই গোলটি হলে ম্যাচ টাইব্রেকার পর্যন্ত গড়াতই না, আর দেশকেও বিশ্বকাপের বাইরে যেতে হতো না। এই একতরফা দোষ চাপিয়েই তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া ও ব্যক্তিগত স্তরে দেওয়া হচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি।
ফিরে এল আন্দ্রে এস্কোবার ট্র্যাজেডির রক্তাক্ত আতঙ্ক
জামিন্টন কাম্পাজের এই পরিস্থিতি বিশ্ব ফুটবলকে সরাসরি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে ঠিক ৩২ বছর আগের অর্থাৎ ১৯৯৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের কালো দিনগুলিতে। সে বছর ২২ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ম্যাচে কলম্বিয়ার তারকা ডিফেন্ডার আন্দ্রে এস্কোবার (Andres Escobar) একটি অনভিপ্রেত আত্মঘাতী গোল (Own Goal) করে বসেন, যার ফলে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় কলম্বিয়া।
এই ঘটনার ঠিক ১০ দিন পর, ২ জুলাই ১৯৯৪ সালে কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরের একটি নাইটক্লাবের বাইরে মাত্র ২৭ বছর বয়সি এস্কোবারকে ঘিরে ধরে আততায়ীরা। আত্মঘাতী গোলের বদলা নিতে তাঁকে লক্ষ্য করে ১২টি গুলি চালানো হয়। প্রতিটি গুলির সাথে খুনিরা ব্যঙ্গ করে চিল চিৎকার করে উঠেছিল— “গোল!”। মাঠের একটি ভুলের জন্য একজন বিশ্বমানের ফুটবলারকে প্রাণ দিতে হয়েছিল কলম্বিয়ার মাফিয়া ও ড্রাগ কার্টেলদের হাতে।
[কলম্বিয়া ফুটবলের জোড়া ট্র্যাজেডি টাইমলাইন]
* ১৯৯৪ বিশ্বকাপ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ওন গোল করেন ডিফেন্ডার আন্দ্রে এস্কোবার।
- পরিণতি: দেশ ছিটকে যাওয়ার ১০ দিনের মাথায় মেডেলিন শহরে আততায়ীর ১২টি গুলিতে খুন হন এস্কোবার।
* ২০২৬ বিশ্বকাপ: সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ে সহজ সুযোগ মিস করেন জামিন্টন কাম্পাজ।
- পরিণতি: দেশ রাউন্ড অফ ১৬ থেকে বিদায় নিতেই ক্রমাগত খুনের হুমকি, দেশ ফিরতে অস্বীকার।
কলম্বিয়া ফুটবল ফেডারেশনের প্রতিবাদ, দেশে ফিরতে নারাজ কাম্পাজ
৩২ বছর পর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে এবার নড়েচড়ে বসেছে কলম্বিয়ার ফুটবল ফেডারেশন (FCF)। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এই খুনের হুমকির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ফুটবলারদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও প্রশাসনের কাছেও দরবার করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও মাঠের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি, বরং হুমকি ও আক্রোশের মাত্রা বেড়েই চলেছে।
বর্তমানে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্লাব ‘রোজারিও সেন্ট্রাল’ (Rosario Central)-এর হয়ে খেলা এই ২৬ বছরের মিডফিল্ডার এতটাই আতঙ্কিত যে, তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই মুহূর্তে কোনো অবস্থাতেই তিনি নিজের মাতৃভূমি কলম্বিয়ায় পা রাখবেন না। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর দলের বাকি ফুটবলাররা দেশে ফিরলেও, কাম্পাজ আর্জেন্টিনা বা অন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এক নজরে কাম্পাজ মামলা ও কলম্বিয়া ফুটবলের বর্তমান পরিস্থিতি:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিশ্বকাপের পর তৈরি হওয়া সংকটের খতিয়ান |
| টার্গেট ফুটবলার | জামিন্টন কাম্পাজ (বয়স: ২৬ বছর, পজিশন: মিডফিল্ডার)। |
| বর্তমান ক্লাব | রোজারিও সেন্ট্রাল (আর্জেন্টিনা)। |
| হুমকির কারণ | সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে রাউন্ড অফ ১৬-এ অতিরিক্ত সময়ে গোল মিস। |
| ঐতিহাসিক যোগসূত্র | ১৯৯৪ সালের ২ জুলাই খুন হওয়া আন্দ্রে এস্কোবারের স্মৃতি। |
| ফুটবলারের অবস্থান | সুরক্ষার স্বার্থে কলম্বিয়ায় ফিরতে সম্পূর্ণ অনীহা ও ভয়। |
খেলাধুলোয় হার-জিত বা মাঠের মধ্যে সুযোগ নষ্ট করা অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু কলম্বিয়ার মতো দেশে যেখানে ফুটবল জুয়া, ড্রাগ মাফিয়া এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাজি ধরার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেখানে মাঠের একটা সাধারণ ভুলও ফুটবলারদের জীবন বিপন্ন করে তোলে। ৩২ বছর আগে আন্দ্রে এস্কোবারকে বাঁচানো যায়নি, যা ছিল বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও যদি জামিন্টন কাম্পাজকে শুধুমাত্র একটি মিসড গোলের জন্য দেশছাড়া হয়ে থাকতে হয়, তবে তা প্রমাণ করে যে কলম্বিয়ার সমাজ ও ফুটবল সংস্কৃতি আজও সেই অন্ধকার যুগ থেকে বেরোতে পারেনি। ফিফা (FIFA)-র এই বিষয়ে কড়া হস্তক্ষেপ করা উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।






