Murshidabad Murder Case Verdict: মুর্শিদাবাদে গাছ কাটা নিয়ে বিবাদের জেরে বৃদ্ধা খুন! ৩ বছর পর অপরাধী পিয়ারুলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ কান্দি আদালতের

source : আনন্দবাজার
গাছ কাটার মতো একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল আস্ত গ্রাম। সেই বিবাদের জেরে কুড়ুলের কোপে প্রাণ হারিয়েছিলেন এক নিরীহ বৃদ্ধা, গুরুতর জখম হয়েছিলেন তাঁর সন্তান। মুর্শিদাবাদের ভরতপুর থানার করাইল গ্রামের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রায় তিন বছর পর অবশেষে এল আদালতের চূড়ান্ত রায়। অপরাধী পিয়ারুল শেখকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ (Order of life imprisonment) দিল মুর্শিদাবাদের কান্দি মহকুমা আদালত।
২০২৩ সালের সেই রক্তাক্ত ২১ সেপ্টেম্বর
মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মুর্শিদাবাদের ভরতপুর থানার করাইল গ্রামের নদীর ধারের একটি বাগানে গাছ কাটতে গিয়েছিলেন এলাকার বাসিন্দা পিয়ারুল শেখ। সেই সময় ওই গ্রামেরই যুবক মহিবুল তাঁকে অবৈধভাবে গাছ কাটতে বাধা দেন। এই বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে তীব্র বচসা শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দু’পক্ষের সমর্থনে গোটা গ্রাম আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যায়।
অভিযোগ, উত্তেজনার চরম মুহূর্তে পিয়ারুল তাঁর সাথে থাকা কাঠ কাটার ধারালো কুড়ুল দিয়ে মহিবুলকে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করেন। রক্তাক্ত এবং গুরুতর জখম অবস্থায় মহিবুল প্রাণ বাঁচাতে নিজের বাড়ির দিকে দৌড়ে পালান, কিন্তু পিয়ারুল কুড়ুল উঁচিয়ে তাঁর পিছু ধাওয়া করেন।
ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে বলি হলেন মা
মহিবুল যখন নিজের বাড়ির উঠোনে এসে পৌঁছান, তখন ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে বাঁচাতে ছুটে আসেন তাঁর ৬২ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা। কিন্তু রাগে অন্ধ পিয়ারুল মহিবুলের মাকেও রেয়াত করেননি। তিনি ওই প্রবীণাকে লক্ষ্য করেও কুড়ুলের একের পর এক কোপ মারেন।
গ্রামবাসীরা লাঠিসোটা নিয়ে ছুটে এলে পিয়ারুল ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কাজনক অবস্থায় মা ও ছেলেকে উদ্ধার করে প্রথমে কান্দি মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা তাঁদের বহরমপুর মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তরিত করার পরামর্শ দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বহরমপুর যাওয়ার পথেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মারা যান ওই বৃদ্ধা। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন তাঁর ছেলে মহিবুল।
[করারইল গ্রাম হত্যাকাণ্ডের টাইমলাইন]
* অপরাধের তারিখ: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩।
* ঘটনাস্থল: করাইল গ্রাম, ভরতপুর, মুর্শিদাবাদ।
* মূল অপরাধ: গাছ কাটা নিয়ে বিবাদে মা ও ছেলেকে কুড়ুল দিয়ে কোপানো।
* আদালতের চূড়ান্ত রায়: ১৩ জুলাই, ২০২৬ (সোমবার)।
২০ জনের সাক্ষ্যদান এবং আদালতের কঠোর সাজা
মৃতার স্বামী তথা মহিবুলের বাবা ভরতপুর থানায় পিয়ারুল শেখের বিরুদ্ধে খুনের লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। এরপর পুলিশ পিয়ারুলকে গ্রেপ্তার করে এবং প্রায় তিন বছর ধরে কান্দি মহকুমা আদালতে এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চলে। সরকারি আইনজীবী জানিয়েছেন, মামলায় মোট ২০ জন প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষীর বয়ান এবং উপযুক্ত ফরেনসিক ও মেডিকেল প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে গত শনিবার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক নীলা শর্মা পিয়ারুলকে দোষী সাব্যস্ত করেন। সোমবার তাঁর সাজার মেয়াদ ঘোষণা করা হয়।
আদালতের নির্দেশিকা অনুযায়ী পিয়ারুলের সাজা:
- ৩০২ ধারা (খুন): যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা (অনাদায়ে আরও ১ বছরের কারাদণ্ড)।
- ৩০৭ ধারা (খুনের চেষ্টা): ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা (অনাদায়ে আরও ১ বছরের কারাদণ্ড)।
- ৩২৬ ধারা (মারাত্মক অস্ত্র দিয়ে আঘাত): ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা (অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদণ্ড)।
কান্দি আদালতের রায়নামা ২০২৬:
| আইনি ধারা (IPC) | অপরাধের বিবরণ | আদালতের দেওয়া চূড়ান্ত সাজা |
| ধারা ৩০২ | বৃদ্ধাকে কুড়ুল দিয়ে নৃশংস খুন | যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড + ₹১০,০০০ জরিমানা। |
| ধারা ৩০৭ | যুবক মহিবুলকে খুনের চেষ্টা | ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড + ₹১০,০০০ জরিমানা। |
| ধারা ৩২৬ | মারাত্মক অস্ত্র দিয়ে গুরুতর জখম | ৩ বছরের কারাদণ্ড + ₹৫,০০০ জরিমানা। |
| মামলার বিচারক | বিচারক নীলা শর্মা | অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক, কান্দি। |
একটি গাছ কাটার বিরোধ যে কতটা ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে এবং একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে, ভরতপুরের এই ঘটনা তারই প্রমাণ। তবে দেরিতে হলেও কান্দি মহকুমা আদালতের এই কঠোর রায় ভরতপুরের করাইল গ্রামের বাসিন্দাদের আইনি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে এনেছে। দোষী পিয়ারুল শেখকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়ে সমাজকে এই বার্তাই দেওয়া হলো যে, আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার পরিণতি কতটা ভয়ানক হতে পারে।






