Hormuz Strait Conflict & Fuel Price India: হরমুজে ফের যুদ্ধের মেঘ, আশঙ্কায় বিশ্ববাজার! ভারতে কি আবারও বাড়বে রান্নার গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম?

source : সংবাদ প্রতিদিন
দুই মহাশক্তিধর দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তি সই হওয়ার পর মনে করা হয়েছিল বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান ‘তৈল ধমনী’ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে এবার স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করবে জ্বালানিবাহী জাহাজগুলি। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ফের মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ঘনিয়ে এসেছে যুদ্ধের কালো মেঘ। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালীতে। এই সংকটের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে এখন একটাই বড় প্রশ্ন—তবে কি এ দেশে আবারও রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া হতে চলেছে?
রণক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য: হরমুজে যুদ্ধের আগুন
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ফের অগ্নিগর্ভ রূপ ধারণ করেছে। হরমুজ প্রণালীতে ভারতীয় নাবিকবাহী একটি জাহাজে ইরানের হামলাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। রবিবার আমেরিকার ফৌজ ইরানের কেশম, সিরিক, বন্দর আব্বাস, জাস্ক এবং বুশেহর-সহ প্রায় ১৪০টি স্পর্শকাতর জায়গায় ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
এর জবাবে পালটা হামলা শুরু করেছে ইরানও। দুই দেশের এই এলোপাথাড়ি যুযুধান লড়াইয়ের জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
জ্বালানি সংকট ও ভারতে মূল্যবৃদ্ধির ইতিহাস
এর আগে ইরান-আমেরিকা ঠান্ডা লড়াইয়ের জেরে যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেল প্রতি অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের বাজারে। লোকসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার জ্বালানির দামে রাশ টেনে রাখলেও, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি বড়সড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিল।
পরবর্তীতে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দফায় দফায় পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয় কেন্দ্র। আর জ্বালানির দাম বাড়ার অর্থ হলো পণ্য পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়া। যার ফলশ্রুতি হিসেবে রান্নার গ্যাস (LPG) থেকে শুরু করে চাল, ডাল, শাকসবজির মতো অতি প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।
[হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব ও বর্তমান সংকট]
* ভৌগোলিক গুরুত্ব: বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
* বর্তমান সংকট: মার্কিন বিমান হানার পর পাল্টা ইরানীয় ড্রোন হামলায় প্রণালী প্রায় অবরুদ্ধ।
* ভারতের প্রভাব: অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় ভারতে প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি ও পেট্রলের দাম ব্যাপক বেড়েছিল।
ভারতের নয়া চাল: এবার কি পরিস্থিতি থাকবে নিয়ন্ত্রণে?
তবে এবারের আন্তর্জাতিক সংকট বিগত মাসগুলির তুলনায় ভারতের জন্য অনেকটাই ভিন্ন। কারণ গত ৯০ দিনে নয়া দিল্লি তেল আমদানির ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে।
- উৎসে বৈচিত্র (Diversification): ভারত এখন আর কেবল মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় দেশগুলির সাথে করা দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়।
- স্পট মার্কেট ব্যবহার: ভারত আন্তর্জাতিক ‘স্পট মার্কেট’ বা তাৎক্ষণিক বাজারের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকে সুবিধাজনক দামে তেল কেনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
- সুরক্ষিত জ্বালানি ব্যবস্থা: এই কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরিবর্তনের কারণে, বৈশ্বিক স্তরে সরবরাহ চেইন ব্যাহত হলেও বিগত মার্চ মাসের তুলনায় ভারত আজ অনেক বেশি স্বাবলম্বী এবং সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত যেভাবে তার জ্বালানি নিরাপত্তাকে নিশ্ছিদ্র করার প্রক্রিয়া জারি রেখেছে, তাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম সামান্য বাড়লেও ভারতের খুচরো বাজারে বা রান্নার গ্যাসে তার বড়সড় ঝাঁঝ এখনই লাগবে না।
এক নজরে তেলের বাজার ও ভারতের রণকৌশল:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | পূর্ববর্তী পরিস্থিতি | বর্তমান রণকৌশল (২০২৬) |
| তেল আমদানির উৎস | উপসাগরীয় দেশগুলির দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা। | রাশিয়া ও তাৎক্ষণিক বাজার (Spot Market) থেকে কেনাকাটা বৃদ্ধি। |
| হরমুজ প্রণালী ব্লকড | ভারতের বাজারে পেট্রল ও গ্যাসের দাম এক ধাক্কায় বৃদ্ধি পেত। | আমদানির বিকল্প রুট থাকায় ঘরোয়া বাজার কিছুটা সুরক্ষিত থাকবে। |
| সরকারি ভরতুকি ও ক্ষতি | তেল বিপণন সংস্থাগুলি বিপুল আর্থিক লোকসানে চলত। | বহুমুখী আমদানির কারণে লোকসানের বোঝা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। |
হরমুজ প্রণালীতে তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তবে ভারতের ক্ষেত্রে সান্ত্বনা একটাই—নয়া দিল্লির সময়োচিত ‘তেল কূটনীতি’ এবং আমদানির বহুমুখীকরণ আমাদের চরম বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতীয় অর্থনীতিতে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক হলেও, রান্নার গ্যাস বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এবার আকাশছোঁয়া হওয়ার আশঙ্কা আগের চেয়ে অনেকটাই কম। এখন দেখার, এই রণক্ষেত্র পরিস্থিতিতে ভারত কীভাবে তার সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।






