প্রেমের নেই কোনো বিনাশ! স্ত্রীর অকালপ্রয়াণে ৭ হাজার গাছে সুবিশাল ‘গিটার অরণ্য’ গড়লেন বিষণ্ণ কৃষক

‘তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে..।’
মৃত্যু কিংবা বিরহ— কোনো কিছুই কি সত্যি ভালোবাসাকে মুছে দিতে পারে? বিশ্বকবির গানে যেমনটা বলা হয়েছে, প্রেমের কোনো বিনাশ নেই। মরণশীল শরীরের অবসান হলেও ভালোবাসার অস্তিত্ব থেকে যায় অনন্তকাল ধরে। সম্রাট শাহজাহান প্রিয়তমা মমতাজের বিচ্ছেদে যমুনার তীরে মার্বেল পাথরে ফুটিয়ে তুলেছিলেন বিশ্ববিশ্রুত তাজমহল। কিন্তু দূর আর্জেন্টিনার এক বিষণ্ণ কৃষক তাঁর অকালপ্রয়াত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসাকে রূপ দিলেন প্রকৃতির এক অপূর্ব ক্যানভাসে— গড়ে তুললেন প্রায় ৭ হাজার গাছের সমন্বয়ে গড়া এক সুবিশাল ‘গিটার অরণ্য’ (Guitar-Shaped Forest)।

স্বপ্নের সূচনা ও এক ট্র্যাজিক বিচ্ছেদ
সময়টা ১৯৭৭ সাল। সেন্ট্রাল আর্জেন্টিনার লাবোলায়ে (Laboulaye) শহরের কৃষক পেদ্রো মার্টিন উরেতা (Pedro Martin Ureta) এবং তাঁর স্ত্রী গ্রাসিয়েলা (Graciela) ছিলেন সুখী দম্পতি। একদিন বিমানযাত্রার সময় আকাশ থেকে নিচে দেখা একটি অদ্ভুত নকশার খামার দেখে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন সংগীতপ্রেমী গ্রাসিয়েলা।
নিজের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র গিটারের আকৃতিতে নিজেদের খামারবাড়িতেও গাছ দিয়ে একটি নকশা তৈরির আবদার করেছিলেন তিনি পেদ্রোর কাছে। কাজের চাপে পেদ্রো তখন বলেছিলেন— “পরে ভাবা যাবে।” কিন্তু সেই ‘পরে’ যে এভাবে ট্র্যাজেডি হয়ে আসবে, তা কে জানত! মাত্র ২৫ বছর বয়সে, চার সন্তানকে রেখে হঠাৎই মৃত্যুকোলে ঢলে পড়েন গর্ভবতী গ্রাসিয়েলা।
[গিটার অরণ্য তৈরির মূল রূপরেখা]
* অবস্থান: লাবোলায়ে (Laboulaye), সেন্ট্রাল আর্জেন্টিনা।
* মোট গাছের সংখ্যা: প্রায় ৭,০০০ চারাগাছ।
* দৈর্ঘ্য: প্রায় ১ কিলোমিটার (০.৬ মাইল)।
* ব্যবহৃত গাছ: সাইপ্রেস (ঘন সবুজ) ও ব্লু ইউক্যালিপটাস (নীলচে ছটা)।
* দৃশ্যমানতা: নাসা (NASA)-র স্যাটেলাইট, গুগল ম্যাপস ও বিমান থেকে।
একলব্য সাধনা: ৪ সন্তানকে মেপে ৭ হাজার চারা রোপণ
স্ত্রীর প্রয়াণের দু’বছর পর, ১৯৭৯ সালে পেদ্রো সিদ্ধান্ত নেন স্ত্রীর সেই অপূর্ণ আবদার পূরণ করবেন। পেশাদার ল্যান্ডস্কেপাররা তাঁর এই ভাবনাকে উন্মাদনা ভেবে ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ভালোবেসে ক্ষ্যাপা মানুষ কি আর পিছু হটে?
আধুনিক কোনো মাপন যন্ত্র না থাকায়, পেদ্রো তাঁর চার ছোট সন্তানকে নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড় করিয়ে মাটিতে দাগ কেটে গাছের সারি চিহ্নিত করতেন। চার দশক ধরে হাড়ভাঙা খাটুনি আর অদম্য জেদে একা হাতে তিনি রোপণ করেন প্রায় সাত হাজার চারাগাছ।
ঘন সবুজ সাইপ্রেস (Cypress) গাছ দিয়ে তৈরি করা হয় গিটারের বডি এবং ভেতরের তারকাঁটা বা স্টার চিহ্নিত অংশ। আর নীলচে ছটার ব্লু ইউক্যালিপটাস (Blue Eucalyptus) গাছ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় গিটারের লম্বা গলা বা নেক (Neck)।

বিমানের ভীতি, অথচ আকাশ থেকে কুর্নিশ বিশ্ববাসীর
সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ও করুণ বিষয়টি হলো, যে মানুষটি স্ত্রীর স্মরণে ১ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃতির এই মহাকাব্য তৈরি করলেন, সেই পেদ্রো মার্টিন উরেতা নিজেই তীব্র বিমানভীতির (Fear of Flying) কারণে কোনোদিন আকাশে উড়ে নিজের তৈরি গিটার অরণ্যটি চোখে দেখতে পারেননি!
কেবল সন্তানদের তোলা ছবিতে বা স্ত্রীর স্মৃতির ক্যানভাসেই তিনি তা অনুভব করেছেন। তবে নাসা-র (NASA) স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে গুগল ম্যাপস কিংবা আর্জেন্টিনার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজের যাত্রীরা আজও জানলা দিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকেন এই চিরন্তন প্রেমের নিদর্শনের দিকে।
এক নজরে সবুজ গিটার অরণ্যের কথা:
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ / তথ্য |
| নির্মাতা | পেদ্রো মার্টিন উরেতা (আর্জেন্টিনার কৃষক) |
| যার স্মরণে তৈরি | প্রয়াত স্ত্রী গ্রাসিয়েলা (Graciela) |
| অরণ্যের দৈর্ঘ্য | প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ স্বরগ্রাম |
| গাছের ধরণ | সাইপ্রেস এবং ব্লু ইউক্যালিপটাস |
| স্বীকৃতি | নাসা স্যাটেলাইট দৃশ্যমান, গুগল আর্থ ও গ্লোবাল ট্যুরিজম |
বাতাসের দোলায় যখন সাইপ্রেস আর ইউক্যালিপটাসের হাজার হাজার পাতা একসঙ্গে মরমর শব্দে কেঁপে ওঠে, মনে হয় যেন শূন্যে ভেসে আসছে অকালপ্রয়াত গ্রাসিয়েলার প্রিয় গিটারের সেই সুর। ইটের তাজমহল হয়তো সময়ের নিয়মে ক্ষয় পায়, কিন্তু পেদ্রোর এই জীবন্ত সবুজ অরণ্য প্রমাণ করে দিয়ে গেল— মৃত্যু জীবনের শেষ হতে পারে, কিন্তু নিখাদ প্রেমের কোনো বিনাশ নেই!






