বর্ষায় গুজরাটে মারণ চান্দিপুরা ভাইরাসের আতঙ্ক! থাবা বসাল শিশুদের শরীরে, মৃত ২২, নেই কোনো প্রতিষেধক

বর্ষার মরশুমে এক ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্য সংকটের মুখে পড়েছে গুজরাট। রাজ্যে দ্রুত থাবা চওড়া করছে মারণ ‘চান্দিপুরা ভাইরাস’ (Chandipura Virus)। মূলত ১৫ বছরের কম বয়সি শিশুরা এই সংক্রমণের শিকার হচ্ছে। গুজরাট স্বাস্থ্য দপ্তরের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজ্যে ২২ জন শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। সংক্রমণ মোকাবিলায় পুরো রাজ্যজুড়ে উচ্চ সতর্কতা (High Alert) জারি করা হয়েছে।
কীভাবে ছড়ায় এই চান্দিপুরা ভাইরাস?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে, চান্দিপুরা ভাইরাস মূলত ‘র্যাবডোভিরিডি’ (Rhabdoviridae) পরিবারের সদস্য। এই ভাইরাসের প্রভাবে আক্রান্তের শরীরে দেখা দেয় ‘অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোম’ (AES) বা ব্রেন ফিভার। ১৯৬৫ সালে মহারাষ্ট্রের নাগপুরের চান্দিপুরা গ্রামে প্রথম এই ভাইরাসের অস্তিত্ব মেলে।
বর্তমানে গুজরাটে এই সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নেওয়ার পেছনে রয়েছে ‘ফ্লেবোটোমাস পাপা তাসি’ (Phlebotomus papatasi) নামের এক বিশেষ প্রজাতির বেলেমাছি বা স্যান্ডফ্লাই। নোংরা পরিবেশ, জমা জল ও আবর্জনা জমে থাকা স্থানে এই মাছি বা মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে এবং এদের কামড় থেকেই ভাইরাসের জীবাণু শিশুর রক্তে মেশে।
[চান্দিপুরা ভাইরাস (Chandipura Virus): এক নজরে]
* ভাইরাসের পরিবার: র্যাবডোভিরিডি (Rhabdoviridae)।
* মুখ্য বাহক: বেলেমাছি বা স্যান্ডফ্লাই, মশা ও এঁটেল পোকা।
* প্রভাব: মস্তিষ্কে সংক্রমণ ও অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিনড্রোম (AES)।
* প্রতিষেধক/টিকা: বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক নেই।
* ঝুঁকি: আক্রান্ত হওয়ার ৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুর আশঙ্কা।
কী কী লক্ষণ দেখে সতর্ক হবেন?
চান্দিপুরা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক উপসর্গগুলি সাধারণ ফ্লু-এর মতোই মনে হতে পারে। তবে দ্রুত চিকিৎসা না হলে বিপদ মারাত্মক রূপ নেয়:
- প্রাথমিক লক্ষণ: তীব্র জ্বর, মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা, বমি ভাব, শরীর দুর্বল হয়ে পড়া ও পেশিতে যন্ত্রণা।
- গুরুতর লক্ষণ: অনবরত কাশি, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি (Seizures) এবং রোগী অচৈতন্য হয়ে কোমা-য় চলে যাওয়া।
- শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় সংক্রমণের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠতে পারে।
সরকারের কড়া পদক্ষেপ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
গান্ধীনগর, সবরকান্থা-হিম্মতনগর, পাটন, রাজকোট এবং ভাবনগরের হাসপাতালগুলিতে বর্তমানে একাধিক শিশু চিকিৎসাধীন। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্যকর্মীরা শহর ও গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কীটনাশক এবং পাউডার ছড়াচ্ছেন।
যেহেতু কোনো ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা নেই, তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধই একমাত্র পথ:
১. শিশুদের সবসময় ফুল হাতা জামাকাপড় পরিয়ে রাখতে হবে।
২. ঘুমানোর সময় মশারি ও ঘরোয়া মশা বা মাছি তাড়ানোর রিপেলেন্ট ব্যবহার করতে হবে।
৩. বাড়ির চারপাশে নোংরা জল বা আবর্জনা জমতে দেওয়া যাবে না।
৪. সামান্য জ্বর, বমি বা খিঁচুনির লক্ষণ দেখলেই কালবিলম্ব না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
এক নজরে গুজরাটে চান্দিপুরা ভাইরাসের চিত্র:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| মোট মৃত্যুর সংখ্যা | ২২ জন শিশু |
| পরীক্ষিত নমুনা | ১৮৪ জন সন্দেহভাজন |
| নিশ্চিত আক্রান্ত (Positive) | ৩৫ জন |
| আক্রান্তের বয়সসীমা | ১৫ বছরের কম |
| সবচেয়ে প্রভাবিত এলাকা | গান্ধীনগর, সবরকান্থা, পাটন, রাজকোট, ভাবনগর |
ভ্যাকসিন না থাকায় চান্দিপুরা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একমাত্র উপায় হলো আগাম সতর্কতা ও দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা। গুজরাট স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ আবেদন জানানো হয়েছে, যেন শিশুদের প্রাথমিক লক্ষণ দেখামাত্রই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও সচেতনতাই পারে আমাদের শিশুদের এই মারণ ভাইরাসের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে।





