পাকিস্তানে চতুর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পথ প্রস্তুত? ‘ঐতিহাসিক দুর্নীতি’ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নকভির মন্তব্যে তোলপাড় পাক রাজনীতি

পাকিস্তানে সেনা অভ্যুত্থান বা ‘মিলিশিয়া রুল’ কোনো অভূতপূর্ব বিষয় নয়। ১৯৫৮ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান, ১৯৭৭ সালে জেনারেল মহম্মদ জিয়া-উল-হক এবং ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ— এই তিনবার সামরিক শক্তির জোরে দেশের ক্ষমতার মসনদ দখল করেছিল পাক ফৌজ। বর্তমানে শাহবাজ শরিফ সরকারের প্রশাসনিক তোলপাড়ের মাঝে সেদেশে কি তবে চতুর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সলতে পাকানো শুরু হয়ে গেল? সেদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির পর পর বিস্ফোরক মন্তব্য সেই জল্পনাকেই আরও তীব্র করে তুলছে।
‘সবচেয়ে বড় দুর্নীতি’ ও নকভির সর্বাত্মক আক্রমণ
সম্প্রতি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন যে সেদেশের পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। শুধু তাই নয়, নকভির দাবি— গত ২১ বছর ধরে দেশে দেদার ঘুষ ও আর্থিক তছরুপ চলছে এবং এটাই পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি।
নকভি স্পষ্ট জানান, এই দুর্নীতির জালে দেশের আমলা, রাজনীতিবিদ, ব্যাংকার থেকে শুরু করে বিচার ব্যবস্থার বিচারকরা পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি দেশের সমস্ত ক্ষমতাশীল অংশকে কাঠগড়ায় তুললেও, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নাম বেমালুম এড়িয়ে গেছেন।
[পাকিস্তানে সামরিক শাসনের ইতিহাস ও বর্তমান সংকট]
* প্রথম অভ্যুত্থান: ১৯৫৮ (ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান)
* দ্বিতীয় অভ্যুত্থান: ১৯৭৭ (জেনারেল জিয়া-উল-হক)
* তৃতীয় অভ্যুত্থান: ১৯৯৯ (জেনারেল পারভেজ মোশাররফ)
* বর্তমান জল্পনা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের জোট
* নিশানা: শাহবাজ শরিফ সরকার ও পাকিস্তানের আমলা-বিচার বিভাগ
সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও নকভি রসায়ন
পাক রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, মহসিন নকভির এই সুর ও শাহবাজ শরিফ সরকারের থেকে তাঁর দূরত্ব একেবারেই আকস্মিক নয়। পাক সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে নকভির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কূটনৈতিক ও মধ্যস্থতার বৈঠকেও সেনাপ্রধানের পাশাপাশি দেখা গেছে নকভিকে।
সেনাকে সমস্ত বিতর্কের বাইরে রেখে বিচার বিভাগ ও রাজনীতিবিদদের ওপর দায় চাপানোর এই কৌশল আদতে শাহবাজ শরিফ সরকারকে কোণঠাসা করে সেনার শাসন বা সেনাসমর্থিত কোনো নতুন কাঠামো তৈরিরই আগাম ইঙ্গিত।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ও নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতা
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করছেন, মহসিন নকভির অন্তরে লুকিয়ে রয়েছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অদম্য বাসনা। সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে ‘হাতে রেখে’ এবং সেনার আস্থাভাজন হয়ে তিনি নিজেকে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন।
যদি সেনাপ্রধান ও নকভির এই অঘোষিত জোট সফল হয়, তবে শাহবাজ শরিফ সরকারকে উৎখাত করে পাকিস্তানে ফের একপ্রস্থ রাজনৈতিক ডামাডোল এবং পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সেনা শাসন কায়েম হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা।
এক নজরে পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| কেন্দ্রীয় চরিত্র | মহসিন নকভি (পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ও আসিম মুনির (পাক সেনাপ্রধান) |
| মূল অভিযোগ | ২১ বছরের ইতিহাস ভেঙে আমলা, রাজনীতিবিদ ও বিচারকদের দুর্নীতি |
| কারা বাদ | পাকিস্তান সেনাবাহিনী (বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে) |
| লক্ষ্য | শাহবাজ শরিফ সরকারের পতন ও ক্ষমতা হস্তান্তর |
| আশঙ্কা | চতুর্থ সামরিক অভ্যুত্থান বা সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার গঠন |
অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় জর্জরিত পাকিস্তানে সেনার ছায়া সবসময়ই প্রবল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই যখন বিচার বিভাগ ও সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির খোলাখুলি অভিযোগ তোলেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে ক্ষমতার অলিন্দে বড় কোনো পরিবর্তন আসন্ন। সেনাপ্রধানের মদতে মহসিন নকভি পাকিস্তানের কুর্সি দখল করেন নাকি চতুর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে, তা সময়ই বলবে।





