Kolkata Yellow Taxi Driver Story: এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতে ইনহেলার! ৭৬ বছর বয়সে অসুস্থ স্ত্রীর ওষুধের জন্য কলকাতার রাস্তায় রবীন্দ্রনাথবাবুর লড়াই দেখে মুগ্ধ নেটপাড়া

source : সংবাদ প্রতিদিন
সিটি অব জয় বা আনন্দের শহর কলকাতার বুকে প্রতিদিন কত শত ভিড়, কত শত মানুষের লড়াইয়ের গল্প হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু লড়াই এমন হয়, যা আমাদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে, জীবনকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখায়। তেমনই এক চলন্ত রূপকথা হলেন ৭৬ বছর বয়সী বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথ সরকার (Rabindranath Sarkar)। কলকাতার রাজপথে জ্যাম আর তীব্র গরমে যখন তরুণ চালকেরাও হাঁপিয়ে ওঠেন, তখন হলুদ ট্যাক্সির (Kolkata Yellow Taxi) স্টিয়ারিং শক্ত হাতে ধরে থাকেন এই প্রবীণ মানুষটি। মাঝে মাঝে তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হলে স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখে অন্য হাতে পকেট থেকে বের করে নেন ইনহেলার। যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার এই অদম্য দায়িত্ববোধ আর বেঁচে থাকার লড়াই দেখে আজ মুগ্ধ গোটা নেটপাড়া।
ফুটো টিনের চালের নীচে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে সংসার, অবসর এখানে বিলাসিতা
দমদমের (Dum Dum) বেদিয়াপাড়ার একটি অত্যন্ত ঘিঞ্জি এলাকার ছোট্ট টিনের ঘরে রবীন্দ্রনাথবাবুর সংসার। ঘরে রয়েছেন তাঁর বয়সের ভারে নুয়ে পড়া অসুস্থ স্ত্রী সন্ধ্যা সরকার। এই দম্পতির কোনো সন্তান নেই, ফলে এই শেষ বয়সে একে অপরের একমাত্র লাঠি। সংসারে উপার্জনের অন্য কোনো দ্বিতীয় পথ নেই। তাই শরীর সায় না দিলেও, হাত-পা কাঁপলেও প্রতিদিন সকাল ৯টা বাজতেই ভাড়ার ট্যাক্সি নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন রবীন্দ্রনাথবাবু। রাত ১০টায় যখন ঘরে ফেরেন, শরীর আর চলে না। কিন্তু পরদিন সকালে আবার সেই একই চাকা ঘোরানোর লড়াই।
প্রবীণ এই ট্যাক্সি চালকের কথায়, “আমাদের মতো মানুষের কাছে অবসর নেওয়াটা একটা বিলাসিতা। আমি একদিন ট্যাক্সি নিয়ে না বেরোলে আমার স্ত্রীর ওষুধ কেনা বন্ধ হয়ে যাবে, রাতে উনুন জ্বলবে না।”
১৯৬৮ সাল থেকে রাজপথের সারথি, নিজের একটা ট্যাক্সি আজও অধরা
রবীন্দ্রনাথ সরকারের এই জীবনসংগ্রাম আজ নতুন নয়। ১৯৬৮ সালে মাত্র ১৮-১৯ বছর বয়সে চালকের পেশায় পা রেখেছিলেন তিনি। দেখতে দেখতে প্রায় ছয়টি দশক (৬০ বছর) ধরে কলকাতার রাজপথের প্রতিটি অলিগলি তাঁর চেনা।
অথচ চরম ট্র্যাজেডি এটাই যে, এত দীর্ঘ কর্মজীবনের পরও নিজের একটা ট্যাক্সি কেনার সামর্থ্য তাঁর হয়নি। আজও প্রতিদিন ৪০০ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে অন্যের গাড়ি চেয়ে নিয়ে রাস্তায় বেরোতে হয় তাঁকে। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির আয়ের একটা বড় অংশই চলে যায় গাড়ির মালিকের ভাড়া মেটাতে। বাকি যেটুকু টাকা পড়ে থাকে, তা দিয়ে কোনো রকমে দু-বেলার চাল-ডাল জোটে। কিন্তু মাথার ওপরের ফুটো টিনের চাল মেরামত করা বা নিজেদের সুচিকিৎসার খরচ জোগানো সব সময় অধরাই থেকে যায়। বর্ষা নামলেই ঘরের ভিতর বালতি, হাঁড়ি পেতে জল সামলাতে হয় এই বৃদ্ধ দম্পতিকে।
[ট্যাক্সি চালক রবীন্দ্রনাথ সরকারের জীবনপঞ্জি]
* বর্তমান বয়স: ৭৬ বছর।
* ড্রাইভিং কেরিয়ারের শুরু: ১৯৬৮ সাল (প্রায় ৬০ বছর ধরে কলকাতার রাস্তায়)।
* বাসস্থান: বেদিয়াপাড়া, দমদম (ফুটো টিনের চালের ঘর)।
* দৈনিক গাড়ির ভাড়া: ৪০০ টাকা (মালিককে দিতে হয়)।
* শারীরিক সমস্যা: দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, দীর্ঘদিনের ক্রনিক হাঁপানি (ইনহেলার সঙ্গী)।
“যা ঠিক মনে হয় দেবেন”— দারিদ্র্যের মাঝেও মাথা নোয়ায়নি আত্মসম্মান
বয়সের সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথবাবুর শরীর ভেঙে পড়েছে। চোখের দৃষ্টিও আগের মতো পরিষ্কার নয়। হাঁপানির টানে বুকটা বারবার ওঠানামা করে। কিন্তু এই সমস্ত শারীরিক কষ্টকেও ছাপিয়ে গিয়েছে তাঁর সততা ও জজ্জ্বল্যমান আত্মমর্যাদা।
আজকাল কলকাতায় যেখানে বাড়তি ভাড়ার জন্য বা মিটারে না যাওয়ার জন্য একদল ট্যাক্সি চালকের বিরুদ্ধে যাত্রীদের ভুরিভুরি অভিযোগ থাকে, সেখানে রবীন্দ্রনাথবাবু এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। কোনো যাত্রীর কাছ থেকে তিনি কখনো জোর করে অতিরিক্ত টাকা চান না। উল্টো কেউ যদি খুশি হয়ে কিছু বেশি দিতে চান, তিনি মৃদু হেসে বলেন, “আপনার যা ঠিক মনে হবে, তাই দেবেন।” এই একটা বাক্যই প্রমাণ করে দেয়, তিনি কোনো দয়া বা ভিক্ষে চাইছেন না, নিজের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন চান মাত্র।
এক নজরে রবীন্দ্রনাথ বাবুর জীবনসংগ্রাম:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | জীবনযুদ্ধের বাস্তব চিত্র |
| নাম ও বয়স | রবীন্দ্রনাথ সরকার (৭৬ বছর)। |
| পেশা | ভাড়ার হলুদ ট্যাক্সি চালক (কলকাতা)। |
| পরিবার | স্ত্রী সন্ধ্যা সরকার (সন্তানহীন দম্পতি)। |
| শারীরিক প্রতিকূলতা | ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি ও মারাত্মক হাঁপানির সমস্যা। |
| আর্থিক অবস্থা | প্রতিদিন ৪০০ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে কোনো রকমে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা। |
| আদর্শ | সততা, হাসিমুখ এবং চরম আত্মসম্মানবোধ। |
সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে রবীন্দ্রনাথবাবুর এই লড়াইয়ের কথা যখন নেটিজেনদের সামনে এসেছে, তখন অনেকেই এই বৃদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত করেছেন। অনেকে তাঁর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথবাবু কারও কাছে হাত পাততে নারাজ, তিনি চান শুধু তাঁর ট্যাক্সিতে যেন যাত্রীরা ওঠেন। এক হাতে ইনহেলার আর অন্য হাতে জীবনের স্টিয়ারিং ধরে রাখা এই প্রবীণ মানুষটি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, সততা আর লড়াই করার মানসিকতা থাকলে মাথা উঁচু করে বাঁচা সম্ভব।






