Changing Colors of Politics: আর জি করে ছিল ‘হুজুগ’, বারুইপুরে ‘মোমবাতি’! ক্ষমতা হারিয়ে মমতার মুখে ‘জাস্টিস’ স্লোগান, তীব্র হচ্ছে দ্বিচারিতার প্রশ্ন

source : সংবাদ প্রতিদিন
রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বলে কিছু হয় না— না ক্ষমতা, না নীতি। আর সেই চরম সত্যেরই এক জীবন্ত নজির হয়ে দাঁড়াল পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ঠিক দু’বছর আগের কথা। ২০২৪ সালে তিলোত্তমার বুকে আর জি কর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় যখন ‘রাতদখল’-এর মতো বিশ্ব কাঁপানো আন্দোলন হচ্ছিল, তখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) কাছে তা ছিল স্রেফ ‘হুজুগ’, ‘নকশাল ও অতি বামেদের চক্রান্ত’। আর আজ, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে গোহারা হেরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলাতেই শোনা যাচ্ছে ‘জাস্টিস’ স্লোগান! বারুইপুরের ঘটনায় মোমবাতি হাতে তাঁর এই ভোলবদলকে ঘিরেই এখন রাজ্য রাজনীতিতে উঠছে চরম ‘দ্বিচারিতা’র প্রশ্ন।
আর জি কর ফাইল খুলতেই কেঁচো খুঁড়তে কেউটে, কাঠগড়ায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী
২০২৬-এর নির্বাচনে সর্বস্ব হারিয়ে তৃণমূলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন খাদের কিনারায়। এরই মধ্যে রাজ্যে নতুন সরকার গঠন হতেই নতুন করে খোলা হয়েছে আর জি কর কাণ্ডের (RG Kar Case) ফাইল। আর তাতেই একের পর এক হাড়হিম করা তথ্য সামনে আসছে।
অভিযোগ উঠেছে, আর জি করের আসল অপরাধীদের আড়াল করতে এবং তদন্তের গতিমুখ ঘুরিয়ে দিতে খোদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। এমনকি তদন্তের সবচেয়ে বড় প্রমাণ তথা নির্যাতিতার ‘ভিসেরার নমুনা’ নষ্ট করার নির্দেশও নাকি ওপর মহল থেকে দেওয়া হয়েছিল! যার জেরে সিবিআই-ও পরবর্তীকালে আসল সূত্র খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়।
তৎকালীন সরকারের এই অপরাধ ঢাকতে পুলিশ প্রশাসনের অতিসক্রিয়তাও আজ প্রমাণিত। সে সময় যে সমস্ত পুলিশ কমিশনার ও ডিসি-রা সাংবাদিক বৈঠক করে অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন ও ক্লিনচিট দিয়েছিলেন, তাঁদের কুকীর্তি এখন প্রকাশ্যে। কলকাতা পুলিশের তিন শীর্ষ পদাধিকারী আজ অন্যায়ের অভিযোগে সাসপেন্ডেড।
বারুইপুরে ২৪ ঘণ্টায় পদক্ষেপ প্রশাসনের, তাও রাস্তায় মমতা
সম্প্রতি বারুইপুরে এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ঘিরে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। তবে ২০২৪-এর আর জি করের মতো বর্তমান প্রশাসন তথ্য আড়াল করার পথে হাঁটেনি। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করে মূল অভিযুক্তসহ সমস্ত জড়িতদের হাজতে পুরেছে নতুন সরকার। এত দ্রুত আইনি পদক্ষেপের নজির রাজ্যে কার্যত বিরল।
কিন্তু প্রশাসনকে এই তৎপরতার কৃতিত্ব দেওয়া তো দূর অস্ত, ছাব্বিশের ভোটে হেরে কোণঠাসা হয়ে পড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে মাঠে নেমে পড়েছেন। আর জি করের সময় যে ‘মোমবাতি মিছিল’ বা ‘রাতদখল’কে তিনি কটাক্ষ করেছিলেন, আজ বারুইপুরের সুবিচারের দাবিতে নিজেই মোমবাতি হাতে রাস্তায় নেমেছেন তিনি।
[মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভোলবদল: ২০২৪ বনাম ২০২৬]
* ২০২৪ (শাসক থাকাকালীন): 'জাস্টিস' স্লোগান শুনলে মেজাজ হারাতেন। আন্দোলনকারীদের অতিবাম-নকশাল বলে দাগিয়ে দিতেন। আর জি কর আন্দোলনকে বলেছিলেন 'হুজুগ'।
* ২০২৬ (বিরোধী আসনে): বারুইপুর কাণ্ডে নিজেই মোমবাতি হাতে রাস্তায়। আর জি করের অনুকরণে নিজে স্লোগান তুলছেন এবং জাস্টিস চাইছেন।
‘তোমার স্বর আমার স্বর’… স্লোগান চুরির দেউলিয়াপনা!
বারুইপুরের মিছিলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্লোগান দেওয়ার ধরণ দেখে তাজ্জব রাজনৈতিক মহল। আর জি কর আন্দোলনের সময় আমজনতার মুখে মুখে ফিরত যে স্লোগান— ‘তোমার স্বর আমার স্বর, জাস্টিস ফর আর জি কর’, ঠিক সেই ধাঁচেই মমতা স্লোগান তুলেছেন— ‘তোমার আমার এক সুর, জাস্টিস ফর বারুইপুর’।
আন্দোলনের এই ধরণ এবং স্লোগান নকল করার ঘটনাকে তৃণমূলের চরম রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা এবং ‘চুরি’ বলে কটাক্ষ করছেন সমাজকর্মী ও নেটিজেনরা। আমজনতার প্রশ্ন, যে আন্দোলনের সুরকে দু’বছর আগে ক্ষমতার দম্ভে পিষে দিতে চেয়েছিলেন জননেত্রী, আজ নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সেই সুরই চুরি করতে হচ্ছে তাঁকে?
এক নজরে আর জি কর বনাম বারুইপুর কাণ্ডে মমতার ভূমিকা:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | ২০২৪ সালের ভূমিকা (আর জি কর কাণ্ড) | ২০২৬ সালের ভূমিকা (বারুইপুর কাণ্ড) |
| রাজনৈতিক অবস্থান | রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং পুলিশমন্ত্রী (শাসক)। | বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত প্রধান বিরোধী মুখ। |
| আন্দোলনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি | আন্দোলনকে ‘হুজুগ’ ও ‘বাম-অতিবামদের উসকানি’ বলে কটাক্ষ। | নিজেই মোমবাতি হাতে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের নেতৃত্ব দান। |
| পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা | তথ্য লোপাট ও ভিসেরা নমুনা নষ্টের অভিযোগ, পুলিশ কর্তাদের দিয়ে অপরাধ আড়াল। | বর্তমান প্রশাসনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে SIT গঠন ও দ্রুত অপরাধী গ্রেপ্তার। |
| স্লোগানের ভাষা | “জাস্টিস তো পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, আর কীসের জাস্টিস?” | “তোমার আমার এক সুর, জাস্টিস ফর বারুইপুর।” (অনুকরণ করা স্লোগান)। |
ক্ষমতায় থাকলে এক নীতি, আর ক্ষমতা হারালে অন্য নীতি— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ভোলবদল পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে আজ জলের মতো পরিষ্কার। আর জি করের নির্যাতিতার রক্তের দাগ এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ যাঁর সরকারের দিকে, তাঁর মুখে বারুইপুরের নির্যাতিতার জন্য ‘জাস্টিস’ স্লোগান এক চরম পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এই দ্বিচারিতা বাংলার মানুষ কীভাবে নেবে, তা আগামী দিনই বলবে।






