Inspiring Mother Son Story: ফুসফুস অচল, ৭০ শতাংশ দৃষ্টিহীনতা! মায়ের তৈরি নোটে পড়াশোনা করে ‘জেইই অ্যাডভান্সড’-এ ওবিসি তালিকায় ৫০তম বিহারের গুঞ্জন

source : সংবাদ প্রতিদিন
রণে-বনে-জলে-জঙ্গলে বিপদে পড়লে যে কোনও সন্তানই সবার প্রথম মায়ের মুখখানিই মনে করে। আর মাও সন্তানের জন্য নির্দ্বিধায় নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করতে পারে। সমস্ত রকমের বিপদের সঙ্গে লড়তে পারে একাই। সম্প্রতি ভারতের কঠিনতম প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘জেইই অ্যাডভান্সড’ (JEE Advanced)-এর ফল প্রকাশের পর এমনই এক মা-ছেলের রূপকথার মতো লড়াইয়ের গল্প সামনে এসেছে, যা দেখে চোখে জল নেটদুনিয়ার। ফুসফুস আংশিক অকেজো এবং ৭০ শতাংশ অন্ধত্বকে জয় করে আইআইটি দিল্লির (IIT Delhi) দরজা খুলে ফেললেন বিহারের গুঞ্জন কুমার। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করার নেপথ্যে কাণ্ডারি হিসেবে দাঁড়িয়ে রইলেন তাঁর মা গুঞ্জাদেবী।
কোটার কোচিং থেকে হঠাৎ শয্যাশায়ী গুঞ্জন
বিহারের সীতামঢ়ির বাসিন্দা গুঞ্জন কুমার ২০২৩ সালে রাজস্থানের কোটা শহরে যান দেশের সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইআইটি-তে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে। সেখানে দুই বছর ধরে কঠোর পরিশ্রমের সাথে জেইই-র প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের পরীক্ষার ঠিক কয়েক মাস আগে হঠাৎই একটি ভারী জিনিস তুলতে গিয়ে তাঁর ফুসফুসে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়।
চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, গুঞ্জন ‘নিউমোথোরাক্স’ (Pneumothorax) বা collapsed lung-এর শিকার হয়েছেন, যার ফলে তাঁর একটি ফুসফুস আংশিকভাবে বসে গিয়েছে। চিকিৎসকদের কড়া নির্দেশে দীর্ঘ তিন মাসের জন্য সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী বা বেডরেস্টে চলে যান গুঞ্জন। কোটার ক্লাসরুমে গিয়ে নিয়মিত ক্লাস করার ক্ষমতা তাঁর আর ছিল না। পরীক্ষার মুখে এই শারীরিক বিপর্যয় গুঞ্জনকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল।
ছেলের ‘সহপাঠী’ হয়ে মায়ের এক আশ্চর্য লড়াই
ঠিক এই চরমতম কঠিন সময়ে গুঞ্জনের রক্ষাকর্তা এবং সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন তাঁর মা গুঞ্জাদেবী। তিনি নিজে হিউম্যানিটিসের (Humanities) ছাত্রী ছিলেন এবং তাঁর বিএড (B.Ed) ডিগ্রি ছিল। কিন্তু বহু বছর আগে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া একজন গৃহবধূর পক্ষে আইআইটি স্তরের জটিল পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও উচ্চতর গণিত বোঝা অবাস্তব ছিল। কিন্তু ছেলের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি পিছু হটেননি।
গুঞ্জাদেবী প্রতিদিন কোটার শিক্ষকদের অনলাইন ক্লাসের সামনে বসতেন। শিক্ষকেরা যা যা বলতেন, তা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনে খাতায় বিস্তারিত নোট তৈরি করতেন। পরবর্তীতে সেই বিজ্ঞান ও গণিতের কঠিন সূত্রগুলি নিজে আগে বুঝতেন এবং তারপর বিছানায় শুয়ে থাকা অসুস্থ গুঞ্জনের মাথায় হাত বুলিয়ে সেই পড়া বুঝিয়ে দিতেন। এভাবেই মাসের পর মাস ছেলের ‘সহপাঠী’ হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান মা।
[গুঞ্জন কুমারের জোড়া শারীরিক প্রতিবন্ধকতা]
১. ফুসফুসের রোগ: নিউমোথোরাক্স (Collapsed Lung) - ৩ মাস সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী।
২. চোখের সমস্যা: হাই মায়োপিয়া (-৯.৫ পাওয়ারের চশমা) - ৭০% দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত।
* সাফল্যের চাবিকাঠি: মায়ের হাতে লেখা অনলাইন ক্লাসের সহজ সরল বিজ্ঞান নোট।
৭০% অন্ধত্বকে হারিয়ে আইআইটি দিল্লির কম্পিউটার সায়েন্স
শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি গুঞ্জন দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর দৃষ্টিশক্তির সমস্যায়ও ভুগছেন। তাঁর চোখের পাওয়ার -৯.৫ এবং প্রায় ৭০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত। সুস্থ হওয়ার পর হাতে থাকা অত্যন্ত কম সময় এবং এই প্রায় অন্ধ চোখের বাধা নিয়েই মায়ের তৈরি নোটে শেষ মুহূর্তের রিভিশন সারেন গুঞ্জন।
অবশেষে প্রকাশিত জেইই অ্যাডভান্সড ২০২৬-এর ফলাফলে দেখা যায়, সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে হারিয়ে ওবিসি (OBC) ক্যাটাগরিতে অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক ৫০ অর্জন করেছেন গুঞ্জন কুমার। দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইআইটি দিল্লির সবচেয়ে ডিমান্ডিং বিভাগ অর্থাৎ ‘কম্পিউটার সায়েন্স’ (Computer Science)-এ ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। তবে এই সাফল্যের পর গুঞ্জন বুক ফুলিয়ে একটাই কথা বলছেন, “এই সাফল্যের ১০০ শতাংশ কৃতিত্ব আমার মায়ের, মা না থাকলে আমি আজ বিছানাতেই পড়ে থাকতাম।”
এক নজরে গুঞ্জন ও তাঁর মায়ের সাফল্যের খতিয়ান:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | জেইই অ্যাডভান্সড ২০২৬-এর লড়াই |
| শিক্ষার্থীর নাম | গুঞ্জন কুমার (সীতামঢ়ি, বিহার)। |
| সহযোদ্ধা মা | গুঞ্জাদেবী (গৃহবধূ ও বিএড ডিগ্রিধারী)। |
| প্রাপ্ত র্যাঙ্ক | ওবিসি (OBC) ক্যাটাগরিতে অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক ৫০। |
| নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান | আইআইটি দিল্লি (IIT Delhi), কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং। |
| লড়াইয়ের হাতিয়ার | মায়ের হাতে তৈরি অনলাইন ক্লাসের ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ও ম্যাথ নোট। |
গুঞ্জন ও তাঁর মায়ের এই গল্প কেবল পরীক্ষায় সফল হয়ে আইআইটি-তে সুযোগ পাওয়ার নয়, বরং চরম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের অপরাজেয় মানসিকতার। যখন দামি কোচিং আর প্রযুক্তির যুগেও একজন ছাত্র সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন, তখন একজন মায়ের মাতৃত্বের জেদ আর অক্লান্ত পরিশ্রমই অসুস্থ সন্তানকে পৌঁছে দিল দেশের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে। সোশাল মিডিয়ায় এখন এই মা ও ছেলের জুটিকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ। গুঞ্জাদেবীর এই লড়াই প্রমাণ করে দিল— মায়ের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো কোচিং ইনস্টিটিউট এই পৃথিবীতে আজও তৈরি হয়নি।






