Sonpur Crime News: বেড়াতে যাওয়ার টাকা না পেয়ে ডাম্বেল দিয়ে মাথায় আঘাত, ৩ দিন বাবার দেহ ঘরে লুকিয়ে ট্রাভেল ব্যাগে ফেলল ছেলে গোপাল!

source : এইসময় অনলাইন
দিল্লির শ্রদ্ধা ওয়াকার বা পুণের সিয়া হত্যাকাণ্ডের মতো দেহ লোপাটের নৃশংস ছক এবার খোদ কলকাতার উপকণ্ঠ সোনারপুরে (Sonarpur)। এবার কোনো পরকীয়া বা সম্পত্তি বিবাদ নয়, স্রেফ বেড়াতে যাওয়ার মোটা অঙ্কের টাকা না দেওয়ায় নিজের জন্মদাতা বাবাকে খুন করে তিন দিন ধরে ঘরের ভেতর লাশ আগলে রাখল ছেলে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনারপুর থানা এলাকার মিলন পল্লির এই হাড়হিম করা ঘটনায় রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা এলাকায়।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২২ জুন রাতে। সোনারপুরের একটি নির্জন রাস্তা থেকে একটি বড় নীল রঙের ট্রাভেল ব্যাগ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই ব্যাগটি খুলতেই উদ্ধার হয় এক অজ্ঞাতপরিচয় প্রৌঢ়ের চরম পচাগলা মৃতদেহ। লাশের কোনো পরিচয় না মেলায় পুলিশ সেটিকে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় এবং একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে।
বাড়ি থেকে বের হওয়া দুর্গন্ধই খুলে দিল রহস্যের জট
এর ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ ২৩ জুন মিলন পল্লির স্থানীয় বাসিন্দারা সোনারপুর থানার পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেন। তাঁরা জানান, এলাকারই একটি বাড়ি থেকে গত কয়েকদিন ধরে তীব্র পচা দুর্গন্ধ বের হচ্ছে এবং বাড়ির মালিক রঞ্জন রায়চৌধুরীকে (Ranjan Raychaudhuri) বেশ কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে না। রঞ্জনবাবু পেশায় একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন এবং ব্যবসার তাগিদে প্রায়ই দুবাই যাতায়াত করতেন।
প্রতিবেশীরা তাঁর ছেলে গোপাল রায়চৌধুরীকে (Gopal Raychaudhuri) বাবার কথা জিজ্ঞাসা করলে সে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে দাবি করে যে, তাঁর বাবা নাকি জরুরি কাজে আবারও দুবাই গিয়েছেন। কিন্তু দুর্গন্ধ বাড়তে থাকায় পুলিশ ওই বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি চালায়।
পুলিশ বাড়িতে ঢুকে দেখে সেখানে দুজন মানসিকভাবে অসুস্থ বৃদ্ধা মহিলা রয়েছেন, যাঁদের দেখভাল করার কেউ নেই। এরপর বাড়ির একটি বন্ধ ঘর খুলতেই চোখ কপালে ওঠে তদন্তকারীদের। ঘরের মেঝে এবং দেওয়ালে ছিটকে পড়া রক্তের দাগ স্পষ্ট! ঘরের এক কোণে পড়েছিল রক্তমাখা ভারী ব্যায়ামের ডাম্বেল।
কীভাবে চলল অপারেশন ‘লোপাট’?
পুলিশ এরপর ওই এলাকার সমস্ত সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করে। তাতেই দেখা যায়, ২২ জুন রাতে একটি নির্দিষ্ট গাড়ি ওই বাড়িটির সামনে এসেছিল এবং তাতে একটি বড় নীল রঙের ব্যাগ তোলা হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে পুলিশ গাড়িচালককে সনাক্ত করে এবং তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
গাড়িচালক পুলিশকে জানায়, ট্রাভেল ব্যাগটি নিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে অতিরিক্ত ভাড়ার টাকা দিয়েছিল গোপাল। গাড়িচালকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই গতকাল, ৩ জুলাই রাতে গা ঢাকা দিয়ে থাকা গোপাল রায়চৌধুরীকে পাকড়াও করে পুলিশ।
খুনের নেপথ্যে ভয়ংকর স্বীকারোক্তি:
পুলিশি জেরার মুখে ভেঙে পড়ে নিজের অপরাধ কবুল করেছে গোপাল। সে জানায়, বন্ধুদের সাথে দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জন্য বাবার কাছে মোটা টাকা দাবি করেছিল সে। কিন্তু বাবা টাকা দিতে সরাসরি অস্বীকার করায় রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঘরে থাকা ডাম্বেল দিয়ে বাবার মাথায় সজোরে আঘাত করে সে। ঘটনাস্থলেই ছটফট করে মারা যান রঞ্জনবাবু।
[সোনারপুর হত্যাকাণ্ডের টাইমলাইন]
মে/জুন: বেড়াতে যাওয়ার টাকা নিয়ে বাবা-ছেলের বিবাদ।
১৯ জুন (আনুমানিক): ডাম্বেল দিয়ে মাথায় আঘাত করে রঞ্জন রায়চৌধুরীকে খুন।
১৯-২২ জুন: প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে টানা ৩ দিন বাপের লাশ ঘরেই আটকে রাখল গোপাল।
২২ জুন (রাত): গন্ধ ছড়াতেই ট্রাভেল ব্যাগে ভরে সাড়ে ৪ কিমি দূরে লাশ ফেলে পালাল ছেলে।
২৩ জুন: প্রতিবেশীদের অভিযোগে ঘরের ভেতর থেকে রক্তের দাগ ও ডাম্বেল উদ্ধার পুলিশের।
৩ জুলাই (শুক্রবার): সিসিটিভি ও ড্রাইভারের তথ্যের ভিত্তিতে মূল অভিযুক্ত গোপাল গ্রেপ্তার।
এক নজরে সোনারপুর পিতৃহত্যা মামলা:
| মৃত ব্যক্তির নাম ও বয়স | প্রধান অভিযুক্ত | খুনের অস্ত্র | খুনের কারণ | দেহ লোপাটের পদ্ধতি |
| রঞ্জন রায়চৌধুরী (৫৯) | ছেলে গোপাল রায়চৌধুরী (ধৃত) | ব্যায়ামের ভারী সরঞ্জাম (ডাম্বেল) | বেড়াতে যাওয়ার টাকা না পেয়ে ক্ষোভ। | ট্রাভেল ব্যাগে ভরে ভাড়া গাড়িতে সাড়ে ৪ কিমি দূরে নিক্ষেপ। |
স্রেফ কিছুটা বিলাসবহুল জীবনযাপন আর বেড়াতে যাওয়ার টাকা না পাওয়ায় নিজের বাবাকে এভাবে খুন করার ঘটনা যুবসমাজের মানসিক অবক্ষয়কে আরও একবার উলঙ্গ করে দিল। সোনারপুর থানার পুলিশ জানিয়েছে, ধৃত গোপালকে আজ আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হবে। এই খুনে গাড়িচালক কেবল টাকার লোভেই ব্যাগটি ফেলেছিল নাকি সেও খুনের ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।






