Taslima Nasreen Kolkata Return: কাটল নির্বাসনের ‘লজ্জা’! প্রায় ২ দশক পর ফের কলকাতায় পা রাখছেন তসলিমা নাসরিন, ১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান

source : Sangbad Pratidin
বদলের বাংলায় এবার সংস্কৃতি ও সাহিত্য জগতে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথা আনন্দের খবর। সুদীর্ঘ দুই দশকের ‘নির্বাসন’ পর্ব কাটিয়ে আবারও কলকাতার বুকে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে চলেছেন প্রখ্যাত ও বহুলাংশে বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ আগস্ট কলকাতার ঐতিহাসিক রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে দেখা যাবে তাঁকে। নিজেই ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ভক্তদের এই খুশির খবর দিয়েছেন লেখিকা। ২০০৭ সালে বাম আমলে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই গ্লানি কাটিয়ে আবারও তিলোত্তমার বুকে স্বাগত জানানো হচ্ছে ‘লজ্জা’ উপন্যাসের স্রষ্টাকে।
১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনে মৌলবাদ বিরোধী কবি সম্মেলন
আগামী ১ আগস্ট কলকাতার রবীন্দ্রসদনে ‘সেক্যুলার মিশন’ এবং ‘এইচআরবিএফএফ’-এর যৌথ উদ্যোগে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে তসলিমা নাসরিনকে ‘মৌলবাদ বিরোধী প্রতিবাদের অগ্নিসম প্রতীক’ হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ফেসবুক পোস্টে তসলিমা নিজেই জানিয়েছেন, এই অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেবেন এবং কবিতা পাঠ করবেন। কুড়ি বছর পর প্রিয় শহর, চেনা গলি আর প্রিয় সাহিত্যিকদের মাঝে ফিরে আসার এই সুযোগে আবেগঘন হয়ে পড়েছেন লেখিকা নিজেই। বাংলার প্রগতিশীল সাহিত্য মহলও এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির জন্য প্রহর গুনছে।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য জমানার সেই ‘অন্ধকার দিন’
২০০৭ সালে তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘দ্বিখণ্ডিত’ (Dwikhandito) প্রকাশকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল কলকাতা। একদল কট্টরপন্থীর আপত্তিতে সংখ্যালঘু প্রধান এলাকাগুলিতে তীব্র অশান্তি ছড়ায়। পরিস্থিতি এতটাই হাতের বাইরে চলে যায় যে কলকাতা সামলাতে শেষমেশ সেনা নামাতে হয়েছিল রাজ্য সরকারকে।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর বামপন্থী বুদ্ধিজীবী মহলের সাথে পরামর্শ করে তসলিমার বইটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার দোহাই দিয়ে তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা ছাড়ার নির্দেশ দেন। তসলিমা অনুরাগীদের মতে, প্রগতিশীল বাংলার সাহিত্য ইতিহাসে সেদিন এক বড় কালো দাগ পড়েছিল।
[তসলিমা নাসরিনের কলকাতা ডায়েরি]
* ২০০৭: 'দ্বিখণ্ডিত' উপন্যাসকে কেন্দ্র করে কলকাতায় দাঙ্গা পরিস্থিতি ও সেনা মোতায়েন।
* নভেম্বর ২০০৭: বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের নির্দেশে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হন তসলিমা।
* ২০২৬ (জুলাই): রাজ্যসভায় শমীক ভট্টাচার্যের তসলিমা-প্রত্যাবর্তন নিয়ে সওয়াল।
* ১ আগস্ট ২০২৬: রবীন্দ্রসদনে কবিতা পাঠের মাধ্যমে দীর্ঘ ২০ বছর পর কলকাতায় প্রত্যাবর্তন।
শমীক ভট্টাচার্যের প্রয়াস ও রাজ্য বিজেপি সরকারের সবুজ সংকেত
তসলিমা নাসরিনের এই দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিজেপি সরকারের সদিচ্ছা বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিজেপি রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য সংসদ ভবনে প্রথম তসলিমার এই নির্বাসন প্রত্যাহারের দাবি তোলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশের ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে বরাবরই সরব হয়েছেন তসলিমা, তাই গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষে তাঁকে আশ্রয় দেওয়া এবং বাংলায় ফিরিয়ে আনা উচিত।
রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই বাম আমলের অলিখিত নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটতে চলেছে। সরকারের সবুজ সংকেত মেলায় অবশেষে রবীন্দ্রসদনের মতো সরকারি প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান।
তসলিমা বিতাড়ন ও প্রত্যাবর্তনের টাইমলাইন:
| সাল | ঘটনাপ্রবাহ | প্রশাসনিক অবস্থান |
| ২০০৩-২০০৪ | ‘দ্বিখণ্ডিত’ বই প্রকাশ ও কট্টরপন্থীদের বিক্ষোভ। | কলকাতা হাইকোর্টে বইটির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়। |
| ২০০৭ | পার্কসার্কাস চত্বরে তীব্র দাঙ্গা, সেনা নামানো হয়। | বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের নির্দেশে তসলিমা কলকাতা ছাড়েন। |
| ২০২৬ | শমীক ভট্টাচার্যের সংসদীয় স্তরে সওয়াল। | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ছাড়পত্র ও প্রত্যাবর্তন অনুমোদন। |
| ১ আগস্ট, ২০২৬ | রবীন্দ্রসদনে মৌলবাদ বিরোধী কবি সম্মেলনে উপস্থিতি। | শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের প্রচ্ছন্ন মদত। |
তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরা কেবল একজন সাহিত্যিকের নিজের প্রিয় শহরে ফেরা নয়; এটি একই সাথে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে সেক্যুলার শক্তির এক বড় জয় বলে মনে করছেন আয়োজকেরা। বাম আমলে যে শহর থেকে তাঁকে অসম্মানজনকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, দক্ষিণপন্থী নতুন সরকারের আমলে সেই শহরেই সসম্মানে লাল গালিচা পেতে বরণ করে নেওয়া হচ্ছে লেখিকাকে। ১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনের এই অনুষ্ঠান বাংলার সাহিত্য ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক তৈরি করতে চলেছে।






