Mid-Day Meal Crisis: রাজ্যের স্কুলে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব পাচ্ছে ইসকন! রুটিরুজি হারানোর আশঙ্কায় ১০ জুলাই কলকাতার বুকে মহাশোভাযাত্রা ও আন্দোলনের ডাক সিটুর

source : আনন্দবাজার
রাজ্যের সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলির মিড-ডে মিল (Mid-Day Meal) ব্যবস্থা নিয়ে এক ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। বাম আমল থেকে গত ১৬ বছর ধরে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (Self Help Group) যে মহিলারা স্কুলগুলিতে নিষ্ঠার সাথে রান্নার দায়িত্ব সামলে আসছিলেন, ২০২৬-এ এসে তাঁদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটে কলকাতার স্কুলগুলির মিড-ডে মিলের দায়িত্ব ‘ইসকন’ (ISKCON)-কে দেওয়ার পাইলট প্রজেক্ট ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। চাকরি ও রুটিরুজি হারানোর আশঙ্কায় এবার জেলা পেরিয়ে কলকাতার বুকে বড়সড় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন লক্ষাধিক মহিলা কর্মী।
ইতিহাস বলছে, গত শতকের সত্তরের দশকে জ্যোতি বসুর আমলে মহিলা ক্ষমতায়নের জন্য স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি হয়। পরবর্তীকালে ২০১০ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে এই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের হাতে স্কুলের মিড-ডে মিল রান্নার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল। ২০১১ সালে পরিবর্তনের পরেও তৃণমূল সরকার এই নীতিতে হাত দেয়নি।
তবে ২০২৬ সালে সরকার বদলের পর অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের বাজেট ঘোষণা পুরো সমীকরণ বদলে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এবং স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের (Deepak Barman) সাম্প্রতিক বয়ানে স্পষ্ট—কলকাতায় ইসকনের এই পাইলট প্রজেক্ট সফল হলে আগামী দিনে রাজ্যের অন্য জেলাতেও মিড-ডে মিলের দায়িত্ব বেসরকারি বা ধর্মীয় ট্রাস্টের হাতে সঁপে দেওয়া হতে পারে।
“কলকাতায় ইসকনের পাইলট প্রজেক্ট সফল হলে অন্যত্র তা চালু হতে পারে।” — ২৩ জুন রেড রোডের অনুষ্ঠানে স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন
বাজেটে অর্থমন্ত্রী মিড-ডে মিলের রাঁধুনিদের সাম্মানিক ভাতা ১,০০০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা করেছিলেন, যার ফলে বর্তমানে তাঁরা মাসে ২,০০০ টাকা করে পাবেন। কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো—যদি ইসকন কেন্দ্রীয়ভাবে রান্না করে স্কুলে খাবার পৌঁছে দেয়, তবে এই রাঁধুনিদের কী কাজ থাকবে?
এই বিষয়ে স্কুল শিক্ষামন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি সদুত্তর না দিয়ে কেবল ‘বেতন বৃদ্ধির’ বিষয়টি আওড়ান। কলকাতার ক্ষেত্রে পুরোনো কর্মীদের চাকরি আদৌ থাকবে কি না, সে বিষয়ে সরকারের কোনও স্পষ্ট বিজ্ঞপ্তি বা গাইডলাইন নেই।
পশ্চিমবঙ্গ মিড ডে মিল কর্মী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মধুমিতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়মের খতিয়ান দিয়ে জানান, স্কুলের পড়ুয়া সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে আইনিভাবে রাঁধুনি নিয়োগ করা হয়।
অনুমোদিত রাঁধুনি নিয়োগের সরকারি নিয়ম:
- প্রথম ২৫ জন পড়ুয়া: ১ জন রাঁধুনি।
- ৪১ জন পড়ুয়া হলে: আরও ১ জন (মোট ২ জন)।
- ১০০ জন পড়ুয়া হলে: ৩ জন রাঁধুনি।
- পরবর্তী প্রতি ১০০ জন পড়ুয়ায়: আরও ১ জন করে রাঁধুনি বৃদ্ধি (যেমন: ৬০০ পড়ুয়া থাকলে ৮ জন রাঁধুনি)।
মিড-ডে মিলের রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান:
| ক্ষেত্র | পরিসংখ্যান |
| কলকাতায় অনুমোদিত রাঁধুনি সংখ্যা | ৩,৬৬৯ জন (৬৫টি সেন্টারে যুক্ত) |
| গোটা রাজ্যে অনুমোদিত রাঁধুনি | প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার জন |
| পরোক্ষভাবে যুক্ত মোট মহিলা কর্মী | প্রায় ৬ থেকে ৭ লক্ষ (সহযোগী সহ) |
দ্রষ্টব্য: অনুমোদিত পদের বাইরে যে সহযোগীরা কাজ করেন, তাঁদের আলাদা টাকা দেয় না সরকার। মূল রাঁধুনিরা নিজেদের টাকা ভাগ করে নেন।
চাকরি বাঁচানোর তাগিদে ইতিমধ্যেই জেলা স্তরে বিক্ষোভ শুরু করেছেন কর্মীরা। পশ্চিমবঙ্গ মিড ডে মিল কর্মী ইউনিয়ন সাফ জানিয়েছে, স্পষ্ট নির্দেশিকা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না। ১০ জুলাই কলকাতার বিক্ষোভে মূলত দুটি প্রধান দাবি তোলা হবে:
- চাকরির লিখিত নিশ্চয়তা: কোনোভাবেই মিড-ডে মিলের দায়িত্ব স্বনির্ভর গোষ্ঠীর হাত থেকে কেড়ে নেওয়া চলবে না এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের কাজের অধিকার লিখিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
- নূন্যতম মজুরি: অসংগঠিত ক্ষেত্রের এই কর্মচারীদের প্রতিদিনের কাজের ভিত্তিতে অন্তত ৩৪০ টাকা প্রতিদিন হিসেবে দৈনিক বেতন দিতে হবে।
কলকাতার ৬৫টি সেন্টারের মাধ্যমে হাজার হাজার স্কুলে খাবার সরবরাহ করা হয়। ইসকনের মতো সংস্থাকে এই দায়িত্ব দিলে খাবারের গুণগত মান উন্নত হতে পারে—এমনটাই যুক্তি সরকারের। তবে এর পেছনে জড়িয়ে থাকা লক্ষাধিক প্রান্তিক মহিলার কর্মসংস্থান ও তাঁদের বেঁচে থাকার লড়াইকে সরকার কীভাবে সমন্বয় করবে, সেটাই এখন দেখার। ১০ জুলাইয়ের বামেদের এই আন্দোলন নবান্নের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।






