Kolkata Construction Banned Suvendu Adhikari: তারাতলা বিপর্যয়ের জের, কলকাতা ও সংলগ্ন ৭ পুর এলাকায় সব নির্মীয়মাণ ভবনের কাজ বন্ধের নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর, গঠিত উচ্চপর্যায়ের অডিট কমিটি

source : সংবাদ প্রতিদিন
তারাতলার ব্রেসব্রিজে নির্মীয়মাণ বহুতল ভেঙে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর এবার নজিরবিহীন প্রশাসনিক পদক্ষেপের পথে হাঁটল রাজ্য সরকার। দুর্নীতি ও বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি স্পষ্ট করে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী মোট ৭টি পুরসভা এলাকার সমস্ত নির্মীয়মাণ বিল্ডিংয়ের কাজ আপাপত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এই ভবনগুলির নকশা পুঙ্খানুপুঙ্খ অডিট করার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার বিধানসভার অধিবেশনে তারাতলা বিপর্যয় নিয়ে সরকারি বিবৃতি দেওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রাক্তন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলের পুর-দুর্নীতি নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানান। তিনি সাফ জানান, কাটমানি ও দুর্নীতির জেরে তিলোত্তমাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কলকাতা, রাজারহাট-নিউ টাউন, মহেশতলা, বজবজ, পুজালি, সোনারপুর এবং বারুইপুর পুরসভা এলাকায় সমস্ত রকমের নির্মীয়মাণ ভবনের কাজ অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই সমস্ত এলাকার প্রতিটি বিল্ডিং প্ল্যান খতিয়ে দেখার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ অডিট কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এই কমিটিতে থাকবেন কলকাতা পুরসভার প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে, শীর্ষ আমলা খলিল আহমেদ, রাজেশ সিনহা, রচনা ভগত, ডিজি বিল্ডিং, ডিজি ফায়ার এবং আইআইটি (IIT) খড়গপুরের বিশেষজ্ঞরা। এই কমিটি প্রতিটি বহুতল ও নির্মাণ প্রকল্পের নকশা খতিয়ে দেখে সবুজ সংকেত দিলে তবেই পুনরায় কাজ শুরু করা যাবে। যদি কোনও প্ল্যানে দুর্নীতি বা ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে সংশ্লিষ্ট প্রোমোটার বা মালিকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি তাঁদের সরাসরি জেলে পাঠানো হবে।
বিধানসভায় তারাতলার সেই অভিশপ্ত গোডাউনের প্ল্যানটি দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ফের প্রমাণ করেন যে, এতে প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং পুরসভার তিন ইঞ্জিনিয়ার—আমিনুর শেখ, নির্মলেন্দু সরকার ও রঞ্জন দাসের সই রয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী তোপ দেগে বলেন, “টাকা নিতে নিতে সিটি অফ জয় কলকাতাকে মৃত্যুপুরী বানিয়েছে তৃণমূল সরকার। এটা আপনাদের পাপের ফল।”
এর পাশাপাশি, পূর্ববর্তী পর্বে শুভেন্দুর উল্লেখ করা রহস্যময় ‘কালী’ চরিত্রের পরিচয়ও এদিন পরিষ্কার হয়েছে। জানা গিয়েছে, এই ব্যক্তির পুরো নাম কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি রাজ্য সরকারের একজন কর্মচারী এবং ফিরহাদ হাকিম যখন মেয়র ছিলেন, তখন তাঁর ওএসডি (অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ, এই কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবুজ সংকেত ছাড়া পুরসভায় কোনও বড় বিল্ডিং প্ল্যান পাস হতো না এবং বাইপাসের ধারের তৃণমূল ভবন নির্মাণের পিছনেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
কলকাতার বুকে দীর্ঘ বছর ধরে চলা প্রোমোটার রাজ এবং পুরসভার একাংশের আধিকারিকদের যোগসাজশে বেআইনি বহুতল নির্মাণের যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল, তারাতলার দুর্ঘটনা তার ভয়ংকর রূপটি সামনে এনেছে। রাজ্য সরকার মনে করছে, কেবল তারাতলা নয়, রাজারহাট, সোনারপুর বা মহেশতলার মতো দ্রুত বর্ধনশীল এলাকাগুলিতেও এই ধরণের বিপজ্জনক ভবনের সংখ্যা প্রচুর। সেই কারণেই একযোগে ৭টি পুর এলাকায় অডিটের এই কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তারাতলা দুর্ঘটনাস্থলে নিরলস কাজ করে যাওয়া ভারতীয় সেনাবাহিনী, এনডিআরএফ (NDRF), কলকাতা পুলিশ এবং সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, বিপর্যয়ের কবলে পড়া পরিবারগুলিকে রাজ্য সরকার সবরকম সাহায্য করবে, তবে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কাউকেই রেয়াত করা হবে না।
একসঙ্গে ৭টি বড় পুরসভা এলাকার সমস্ত নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন। এর ফলে রিয়েল এস্টেট শিল্পে সাময়িক প্রভাব পড়লেও, সাধারণ মানুষের সুরক্ষার স্বার্থে এবং বেআইনি সিন্ডিকেট রাজ সমূলে উপড়ে ফেলতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আইআইটি খড়গপুরের বিশেষজ্ঞদের এই অডিট কমিটিতে রাখা প্রমাণ করে যে সরকার বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত চাইছে।
তারাতলার দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতির পারদ এখন তুঙ্গে। ফিরহাদ হাকিমের সই থাকা ফাইলের পর তাঁর প্রাক্তন ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সরাসরি দুর্নীতিতে জড়িয়ে যাওয়ায় চরম অস্বস্তিতে বিরোধী শিবির। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই কড়া অবস্থান আগামী দিনে কলকাতার আবাসন শিল্পে স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং অপরাধীদের শাস্তি দিতে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার।






