Kolkata Taratala Scams: ‘ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশেই পুরসভায় ওএসডি হন কালীচরণ’, তারাতলা বিপর্যয়ে এবার অভিষেকের নাম জড়িয়ে বিস্ফোরক মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

source : সংবাদ প্রতিদিন
তারাতলার ব্রেসব্রিজে নির্মীয়মাণ ভবন ভেঙে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় অব্যাহত। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিপর্যয়ের নকশা ও অনুমোদন সংক্রান্ত দুর্নীতির যে খতিয়ান তুলে ধরেছিলেন, তার রেশ ধরে এবার সরাসরি নাম জড়াল ‘কালীঘাট তৃণমূল’-এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন, কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়রের ওএসডি পদে থাকা বিতর্কিত সরকারি কর্মচারী কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেপথ্যে আসলে ছিল ক্যামাক স্ট্রিটের হাত।বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত কড়া সুরে কলকাতার বেআইনি নির্মাণ ও প্রোমোটার সিন্ডিকেটের সঙ্গে রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বের আঁতাত ফাঁস করেন। শুভেন্দুর কথায়, “ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশেই কলকাতা পুরসভায় নিয়োগ করা হয়েছিল কালীকে। আর এই কালী জানে না, এমন কোনও বিল্ডিং বা বহুতল কলকাতায় নেই। শহরের সব বেআইনি ও ত্রুটিপূর্ণ বিল্ডিংয়ের অনুমোদন হতো ওর একার কথায়।” মুখ্যমন্ত্রী ফের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “কালীকে পুরোপুরি কড়া জেরার মুখোমুখি করলেই সমস্ত কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি এবং রাঘববোয়ালদের নাম সামনে চলে আসবে।”
মুখ্যমন্ত্রীর এই বিবৃতির পর থেকেই রাজ্যজুড়ে চর্চায় উঠে এসেছেন এই রহস্যময় ‘কালী’ ওরফে কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কে এই ব্যক্তি এবং কীভাবে কলকাতা পুরসভায় তাঁর এই উল্কাগতিতে উত্থান ও দাপট তৈরি হলো, তা নিয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে।অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ২০০৩ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস (WBCS) পরীক্ষায় সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে তিনি ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরে যোগ দেন। এরপর ২০০৬ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিস (WBPS) পরীক্ষায় বসে প্রথম হন এবং ২০০৮ সালে রাজ্য পুলিশে যোগ দিলেও বিশেষ কারণে প্রশিক্ষণের সময়ই সেই চাকরি ছেড়ে ফের ভূমি রাজস্ব দপ্তরে ফিরে যান।
২০১০ সাল থেকে কলকাতা পুরসভায় কাজ শুরু করেন কালীচরণ। সেই সময় ফিরহাদ হাকিম ছিলেন পুরসভার মেয়র পারিষদ এবং কালীচরণ তাঁর আপ্ত সহায়ক হিসেবে কাজ করতেন। ২০১৮ সালে ফিরহাদ হাকিম কলকাতার মেয়র হওয়ার পর, শোনা যায় ক্যামাক স্ট্রিটের সরাসরি নির্দেশেই কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি) পদে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকেই পুরসভায় উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে কালীর দাপট।কলকাতা পুরসভার কর্মী ও আধিকারিকদের সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিগত কয়েক বছরে পুরসভার অন্দরে যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ চলত এই কালীচরণের অঙ্গুলিহেলনে। তাঁর নির্দেশ বা গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া পুরসভার একটি পাতাও নড়ত না। কোনও আধিকারিক বা ইঞ্জিনিয়ার স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতেন না।
কালীচরণ এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস ছিল না কারও। এমনকি কোনও বিষয়ে মেয়রের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলেও আগে টপকাতে হতো এই কালীচরণকে। তাঁর অনুমতি ছাড়া খোদ মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গেও কেউ দেখা করতে পারতেন না।মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তারাতলা কাণ্ডের পর রাজ্য সরকার কোনও রকম রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে মাথা নত করবে না। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে কালীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই এফআইআর দায়ের করা হয়েছে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, এই ঘটনার সঙ্গে ক্যামাক স্ট্রিটের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।তারাতলার বহুতল ভাঙার তদন্ত কেবল পুরসভার কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ারের গাফিলতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসের দিকে আঙুল তোলায় এই তদন্ত এখন এক গভীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেলেঙ্কারির রূপ নিল। ওএসডি পদের অপব্যবহার করে কীভাবে গোটা কলকাতার নির্মাণ শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো, কালীর কীর্তি প্রকাশ্যে আসায় তা প্রমাণিত।তারাতলার মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সূত্র ধরে কলকাতা পুরসভার দীর্ঘদিনের ‘লুকানো কঙ্কাল’ একে একে বাইরে আসছে। মেধাবী ডব্লিউবিসিএস অফিসার থেকে ক্যামাক স্ট্রিটের আশীর্বাদধন্য পুরসভার সর্বেসর্বা হয়ে ওঠা কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পতন অত্যন্ত নাটকীয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া অবস্থানের পর, এই তদন্তের আঁচ ক্যামাক স্ট্রিট বা ফিরহাদ হাকিমের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।






