Taratala Building Collapse Suvendu Adhikari: তারাতলা বিপর্যয়ে মৃত বেড়ে ৯, ‘ফিরহাদ হাকিমের সই ছিল নকশায়’, বিধানসভায় বিস্ফোরক মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

source : সংবাদ প্রতিদিন
কলকাতার তারাতলার ব্রেসব্রিজে নির্মীয়মাণ বহুতল বিপর্যয়ের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, এই দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯ জনে পৌঁছেছে এবং এখনও ২০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনা নিয়ে রাজনীতি না করার বার্তা দিলেও, পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে কলকাতা পুরসভার চরম দুর্নীতি ও বেনিয়মকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভেঙে পড়া ভবনের নকশায় স্বয়ং প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সই ছিল।
বৃহস্পতিবার বিধানসভার অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তারাতলা কাণ্ড (Taratala Factory Collapse) নিয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য ও নথি পেশ করেন। তিনি জানান, গত ১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভা এই বিতর্কিত গোডাউন প্ল্যানের অনুমোদন দিয়েছিল। সেই ফাইলে তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের স্পষ্ট স্বাক্ষর রয়েছে। ফিরহাদ হাকিম ছাড়াও পুরসভার তিন জন ইঞ্জিনিয়ারের সই রয়েছে ওই ফাইলে।
মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় কড়া সুরে বলেন, “টাকা নিতে নিতে সিটি অফ জয় কলকাতাকে মৃত্যুপুরী বানিয়েছে তৃণমূল সরকার। এটা আপনাদের পাপের ফল। একাধিক বড় দুর্ঘটনা থেকে আপনারা কোনও শিক্ষা নেননি। এখানে প্রাক্তন মেয়রের সই আছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কাউকেই রেয়াত করা হবে না এবং কলকাতা পুরসভার দোষী আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি পদক্ষেপ করা হবে।
তদন্তের অগ্রগতির কথা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই অপরাধমূলক গাফিলতির জেরে ইতিমধ্যেই ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্ল্যান অনুমোদনের ফাইলে সই থাকা পুরসভার তিন আধিকারিক—সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আমিনুর শেখ, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার নির্মলেন্দু সরকার এবং কার্যনির্বাহী ইঞ্জিনিয়ার রঞ্জন দাসের নামও এদিন সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এর পাশাপাশি, পুরসভার জরুরি পরিকাঠামোর অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “জরুরিকালীন পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজ করার জন্য কলকাতা পুরসভা কোনও অত্যাধুনিক যন্ত্র কেনেনি। তারা বাংলার চরম ক্ষতি করে দিয়ে গিয়েছে।” বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী ডাকা হয়েছে এবং ভারতীয় সেনার বিহার রেজিমেন্ট অত্যাধুনিক আধুনিক যন্ত্র নিয়ে এসে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করেছে।
তারাতলা কাণ্ডের সূত্র ধরে কলকাতা পুরসভার দীর্ঘদিনের অন্দরের দুর্নীতিকে সামনে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, পুরসভার বিভিন্ন বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদনের পিছনে একটি বড় সিন্ডিকেট কাজ করত। এই প্রসঙ্গে ‘কালী’ নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন তিনি।
শুভেন্দুর দাবি, “কলকাতা পুরসভায় কী খেলা হয়েছে আমরা সব জানি। ওই কালী নামের ব্যক্তিকে ধরলেই সমস্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য ও কোটি কোটি টাকার কেলেঙ্কারি বেরিয়ে আসবে। কালী সায় না দিলে পুরসভায় কোনও প্ল্যান পাস হতো না। এই কালীই আবার ইএম বাইপাসের ধারে তৃণমূল ভবন তৈরি করছে।” এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিপর্যয় মোকাবিলায় নিয়োজিত সমস্ত বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি সেনার বিহার রেজিমেন্ট, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), কলকাতা পুলিশ এবং সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারীদের ভূয়সী প্রশংসা করেন, যাঁরা দিনরাত এক করে দুর্ঘটনাস্থলে সাধারণ মানুষকে উদ্ধারের কাজ চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, এই সই বিতর্ক সামনে আসার পর বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
ফিরহাদ হাকিমের সই থাকা এবং পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের সরাসরি যোগসূত্র সামনে আসায় তারাতলা দুর্ঘটনা এখন কেবল একটি বিপর্যয় নয়, বরং বড়সড় পুর-দুর্নীতির আকার নিল। মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি প্রাক্তন মেয়রের বিরুদ্ধে তদন্তের ইঙ্গিত দেওয়ায় আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতি ও প্রশাসনিক স্তরে বড়সড় রদবদল বা আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তারাতলার দুর্ঘটনা কলকাতার পুর-প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে নগ্ন করে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হুঁশিয়ারি এবং ৫ জনের গ্রেপ্তারি প্রমাণ করে যে রাজ্য সরকার এই ঘটনায় আপস করতে নারাজ। এখন দেখার, প্ল্যানে সই থাকা পুর-ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রাক্তন মেয়রের বিরুদ্ধে আগামী দিনে জল কতদূর গড়ায় এবং ‘কালী’ রহস্যের জট কীভাবে খোলে।






