Kolkata Taratala Collapse: ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়েই তারাতলার ধ্বংসস্তূপে শেষ ২০ বছরের রোহিত, কাটোয়ার গাজিপুর গ্রামে কান্নার রোল

source : সংবাদ প্রতিদিন
ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা শেষ করে ভালো একটি সংস্থায় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ করবেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য স্ক্রিপ্ট লিখে রেখেছিল। পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবা আর অভাবের সংসারের জোয়াল কাঁধে তুলে নিতে বই-খাতা ছেড়ে মাত্র ২০ বছর বয়সেই তাকে বেছে নিতে হয়েছিল শ্রমিকের পেশা। কলকাতার তারাতলায় ব্রেসব্রিজের কাছে নির্মীয়মাণ সেই অভিশপ্ত গুদাম ও হিমঘর বিপর্যয় কেড়ে নিল পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার গাজিপুর গ্রামের বাসিন্দা তরুণ রোহিত চৌধুরীর প্রাণ। কেরিয়ারের প্রথম কর্মক্ষেত্রই যে তাঁর জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠবে, তা কল্পনাও করতে পারেনি পরিবার।
কাটোয়া থানার অন্তর্গত গাজিপুর গ্রামের বাসিন্দা বেনারস চৌধুরী ও নিলমদেবীর বড় ছেলে ছিলেন রোহিত। দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট ভাই রোহন বর্তমানে অগ্রদ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। রোহিত ২০২৪ সালেই সফলভাবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তাঁর আইটিআই (ITI) পড়তে যাওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি চূড়ান্ত ছিল। ঠিক এই সময়েই পরিবারে নেমে আসে এক চরম বিপর্যয়। প্রায় তিন বছর আগে রোহিতের বাবা বেনারস বাবু হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।
উপার্জনক্ষম ব্যক্তির এমন করুণ দশায় পরিবারে তীব্র আর্থিক অনটন দেখা দেয়। সংসার বাঁচাতে এবং ছেলেদের মুখে অন্ন তুলে দিতে মা নিলমদেবী নিজে সবজি বিক্রির পেশা বেছে নেন। প্রতিদিন ভোরবেলা থেকে বাজারে সবজি বিক্রি করে দুপুরে বাড়ি ফিরে আবার ঘরের কাজ সামলাতে হতো তাঁকে। মায়ের এই হাড়ভাঙা খাটুনি ও সংসারের শোচনীয় পরিস্থিতি দেখে নিজের পড়াশোনার স্বপ্ন আপাতত সরিয়ে রেখে উপার্জনের রাস্তা খুঁজতে শুরু করেন রোহিত।
রোহিতের মামাবাড়ি নদিয়ার কৃষ্ণনগরে। তাঁর মামা সুভাষ চৌধুরী নিজে নির্মাণকাজের ঠিকাদারি করেন। ভাগ্নের এই কঠিন পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে তিনি তারাতলার ওই নির্মীয়মাণ বড় গুদামে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেন। সংসারের হাল ফেরাতে গত ছয় মাস আগে সেখানে ফিডার মেকানিকের সহকারী বা হেল্পার হিসেবে কাজে যোগ দেন ২০ বছরের ওই তরুণ।
নিলমদেবী কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শেষবার ছেলের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছিল। তিনি ছেলেকে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রোহিত মাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল, জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহেই কাকার বিয়ে রয়েছে, তাই সেই সময় একবারে ছুটি নিয়ে সে বাড়ি ফিরবে। মায়ের সঙ্গে সেটিই ছিল রোহিতের জীবনের শেষ কথা।
বুধবার দুপুরে তারাতলার সেই তিনতলা ভারী কাঠামোটি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার খবর টেলিভিশনের পর্দায় ব্রেকিং নিউজ হিসেবে দেখতে পান কৃষ্ণনগরে থাকা রোহিতের এক দিদি। খবর দেখা মাত্রই বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে তাঁর। ওই অভিশপ্ত শেডের নিচেই ভাই কাজ করত ভেবেই আশঙ্কায় কু ডাকছিল মন। তিনি আর স্থির থাকতে না পেরে তৎক্ষণাৎ স্বামীর সঙ্গে কলকাতার এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে ছোটেন।
সেখানে পৌঁছে জরুরি বিভাগে যখন ভাইয়ের নিথর দেহটি দেখেন, তখন তাঁর আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নেয়। ভাই আর নেই—এই নির্মম সত্যিটা শোনার পর থেকে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছেন না রোহিতের দিদি। হাসপাতালের করিডোরেই অঝোরে কেঁদে চলেছেন তিনি।
তারাতলার এই বহুতল বিপর্যয়ে ১১ জন শ্রমিকের প্রাণ গিয়েছে, যার মধ্যে রোহিতের মতো এমন অনেক তরুণ রয়েছেন যাঁরা সংসারের একমাত্র আশার প্রদীপ ছিলেন। প্রোমোটার এবং ঠিকাদারি সংস্থার এই চরম গাফিলতি ও সুরক্ষাবিধির অভাব কেবল একটি বহুতল ধ্বংস করেনি, বরং ধ্বংস করে দিয়েছে কাটোয়ার এক প্রান্তিক পরিবারের ভবিষ্যৎ ও স্বপ্নকে।
ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার অদম্য ইচ্ছা বুকে চেপে রাখা রোহিত চৌধুরী আজ কাটোয়ার গাজিপুর গ্রামের এক নিথর কফিন। যে ছেলে সংসারের হাল ধরতে কলকাতায় পাড়ি দিয়েছিল, সে এভাবে ফিরবে তা মেনে নিতে পারছে না গ্রামবাসীও। দোষীদের কঠোর শাস্তি হয়তো হবে, কিন্তু নিলমদেবীর কোল খালি করে চলে যাওয়া এই তরতাজা যুবকের অভাব মেটানোর সাধ্য কারোর নেই।






