Kolkata Taratala Collapse: তারাতলা বিপর্যয়ে মৃত বেড়ে ১১, নির্মাণস্থলে ছিল না কোনো রেজিস্টার! ধন্দে ‘সিট’-এর তদন্তকারীরা, পুর-ইঞ্জিনিয়ারদের জেরার সম্ভাবনা

source :সংবাদ প্রতিদিন
তারাতলার ব্রেসব্রিজ এলাকায় নির্মীয়মাণ গোডাউন ও হিমঘর ভেঙে পড়ার ঘটনায় ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতির জটিলতা কমেনি। বৃহস্পতিবার লালবাজারের অ্যাডিশনাল সিপি (ক্রাইম) কুহাল আগরওয়াল সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, এত বড় একটি বাণিজ্যিক পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ চললেও সেখানে শ্রমিকদের উপস্থিতির কোনো রেজিস্টার বা খাতা মেইনটেন করা হতো না। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আর ঠিক কতজন মানুষ চাপা পড়ে রয়েছেন, সেই সুনির্দিষ্ট তথ্য পেতে চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) সূত্রে জানা গিয়েছে, কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এই ৬৬৮৯ বর্গমিটারের বিশাল জায়গাটি ৩০ বছরের জন্য লিজে নিয়েছিলেন শম্ভুনাথ বেহেরা। পূর্বে তিন ভাইয়ের মালিকানাধীন ‘বেহেরা ব্রাদার্স’ নামের সংস্থাটি চললেও, পরবর্তীতে শম্ভুনাথ বাবু এর একক মালিক হয়ে যান। তিনিই এই জমিতে গুদাম ও কোল্ডস্টোরেজ তৈরির কাজ করাচ্ছিলেন।
এই কাজের জন্য ‘অয়ন ট্রেডার্স’ নামক একটি ঠিকাদারি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যার তদারকি করছিলেন আসগর হোসেন নামের এক ব্যক্তি। পুলিশের দাবি, বুধবারের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে খোদ আসগর হোসেনও প্রাণ হারিয়েছেন। এই ঘটনায় পুলিশ অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে এখনও পর্যন্ত মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির অধীনে অনিচ্ছাকৃত খুন, খুনের চেষ্টা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
তদন্তে নেমে ধৃতদের অপরাধমূলক অতীতও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। জানা গিয়েছে, মৃত ঠিকাদার আসগর হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বে ইকবালপুর এবং দক্ষিণ বন্দর থানায় দুটি অপরাধের মামলা দায়ের ছিল। এছাড়া ধৃতদের মধ্যে অন্যতম সৈয়দ মহম্মদ গুলজারের বিরুদ্ধেও রয়েছে পুরনো আইনি রেকর্ড।
যেহেতু মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছেন যে, এই বছরের ১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভা এই বিপজ্জনক গোডাউন প্ল্যানের অনুমোদন দিয়েছিল, তাই লালবাজারের গোয়েন্দারা এবার সরাসরি পুরসভার ভূমিকার ওপর নজর দিয়েছেন। ভেঙে পড়া এই গুদাম সংক্রান্ত সমস্ত অনুমোদিত নকশা ও ফাইল চেয়ে কলকাতা পুরসভাকে চিঠি পাঠিয়েছে লালবাজার। পুলিশ জানিয়েছে, প্রয়োজনে এই প্ল্যান পাসের সঙ্গে যুক্ত পুরসভার অ্যাসিস্ট্যান্ট ও এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারদের সরাসরি ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
বুধবার দুপুরে তারাতলার এই নির্মীয়মাণ কাঠামোটি কংক্রিট ঢালাইয়ের অতিরিক্ত ওজন সহ্য করতে না পেরে ভেঙে পড়ে। নিম্নমানের লোহা এবং সঠিক পরিকাঠামো ছাড়াই তিনতলা ভবনটি খাড়া করার কারণেই এই মর্মান্তিক বিপর্যয় বলে প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার লালবাজারের পুলিশ কমিশনারেটের পক্ষ থেকে নিহত ও আহতদের একটি আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা দল ও সেনাবাহিনীর যৌথ দল এখনও রড ও কংক্রিটের চাঁই কেটে ভেতরে তল্লাশি চালাচ্ছে।
নিহত ১১ জনের তালিকা: কৃষ্ণ চৌধুরী, রোহিত চৌধুরী, চন্দ্রমা চৌধুরী, রাহুল চৌধুরী, পাপ্পুকুমার রজক, ঘি কুমার, আসগর হোসেন, সাহিল সর্দার, হাসান ইমাম, গণেশ কালান্দি এবং নবীন সিং।
বর্তমানে কলকাতার এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে মোট ১৯ জন গুরুতর জখম অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁরা হলেন— দুর্বাশা মাল্লাহ, মণিচাঁদ কুমার, শহিদ কুমার, বিশ্ব প্রকাশ, রাজেশ রুইদাস, বোদন মুণ্ডা, রাজেন্দ্র রাও, রামপ্রসাদ চৌধুরী, মহম্মদ আবিদ খান, সূরজ চৌধুরী, জওহর আলি গায়েন, দেবাশিস দাস, আরমান খান ওরফে মহম্মদ সোনু, সন্দীপ পাণ্ডে, মুস্তাকিন গায়েন, রাজকুমার রজক, কার্তিক পাত্র, খালেক সর্দার এবং মান্নু কুমার।
নির্মাণাধীন সাইটগুলিতে শ্রমিকদের কোনো ডেটা বা রেজিস্টার না রাখা আইনের চোখে বড় অপরাধ। এই গাফিলতির কারণে উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, কারণ ঠিক কতজনের পরিবার নিখোঁজের অপেক্ষায় বসে আছেন তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে, লালবাজার সরাসরি পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনায় এই মামলাটি এবার প্রশাসনিক গাফিলতির এক বড়সড় নজির হিসেবে সামনে আসছে।
তারাতলার এই বহুতল দুর্ঘটনা ১১টি পরিবারের প্রদীপ নিভিয়ে দিল। পুলিশ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করলেও এবং পুরসভার ফাইল তলব করলেও, যে পরিকাঠামোগত বেনিয়ম ও খামতি সামনে এসেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ করে দোষী আধিকারিক ও প্রোমোটারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হলে কলকাতার আবাসন ক্ষেত্রে এই ধরণের মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হবে।






