Kolkata Taratala Collapse Miracle: ‘আমাকে বাঁচা’! ১৪ ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে বন্ধুকে ফোন শ্রমিকের, মোবাইল লোকেশন ট্র্যাক করে ‘মিরাকল’ উদ্ধার তারাতলায়

source :সংবাদ প্রতিদিন
কলকাতার তারাতলার ব্রেসব্রিজে নির্মীয়মাণ বাণিজ্যিক ভবন বিপর্যয়ের পর যেখানে একের পর এক নিথর দেহ উদ্ধার হচ্ছিল, ঠিক তখনই সেখানে ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য অলৌকিক ঘটনা বা ‘মিরাকল’। মৃত্যুর অন্ধকার গহ্বর থেকে স্রেফ একটি ফোন কলের ওপর ভর করে ফিরে এলেন এক তরতাজা যুবক। ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ১৪ ঘণ্টা আটকে থাকার পর নিজের মোবাইল থেকে বন্ধুকে ফোন করেছিলেন বিহারের মুঙ্গেরের বাসিন্দা শ্রমিক মনু কুমার। আর সেই সূত্র ধরেই ঠিক সিনেমার কায়দায় উদ্ধারকারীরা তাঁকে জীবিত অবস্থায় টেনে আনলেন খাদের মুখ থেকে।
গত বুধবার বেলা ১২টা ৭ মিনিটে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছিল তারাতলার বিশাল নির্মীয়মাণ গুদাম ও কোল্ডস্টোরেজটি। নিমেষের মধ্যে কংক্রিট ও লোহার ভারী কাঠামোর নিচে চাপা পড়ে যান বহু শ্রমিক। পুলিশ, দমকল, এনডিআরএফ (NDRF) এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে রাতভর যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছিলেন। কিন্তু বুধবার রাত পর্যন্ত অনেক শ্রমিকের মতোই খোঁজ মিলছিল না বিহারের মুঙ্গেরের বাসিন্দা মনু কুমারের। পরিবার ও বন্ধুরা যখন সব আশা হারাতে বসেছেন, তখনই ঘটে সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা।
বুধবার রাত তখন প্রায় দেড়টা। আচমকা মনুর বন্ধু সন্তোষ কুমারের মোবাইলের স্ক্রিনটা জ্বলে ওঠে। ওপাশ থেকে মনুর ফোন! ফোন রিসিভ করতেই সন্তোষ বুঝতে পারেন ওদিকের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। মনু তখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে মনু শুধু বলতে পেরেছিলেন, “আমাকে বাঁচা।” সন্তোষ তৎক্ষণাৎ মনুকে হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লোকেশন পাঠাতে বলেন, কিন্তু তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে থাকা মনুর পক্ষে তখন সেই কাজ করা সম্ভব ছিল না।
ফোনে বন্ধুর এই আকুতি শোনার পর আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেননি সন্তোষ ও বিভূতি নামের অপর এক যুবক। তাঁরা মাঝরাতেই সোজা ছুটে যান আলো-আঁধারিতে ঘেরা তারাতলার দুর্ঘটনাস্থলে। সেখানে কর্তব্যরত উদ্ধারকারী দল ও পুলিশ আধিকারিকদের তাঁরা জানান যে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মনু এখনও বেঁচে আছেন এবং তিনি ফোন করেছিলেন।
এই তথ্য পাওয়া মাত্রই নতুন উদ্যমে কাজে নামেন উদ্ধারকারীরা। মনুর মোবাইল নম্বরটি নিয়ে দ্রুত তাঁর টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ধ্বংসস্তূপের ঠিক কোন অংশের নিচে মোবাইলটি সক্রিয় রয়েছে, তা চিহ্নিত করে ফেলেন বিশেষজ্ঞরা। এরপর নির্দিষ্ট ওই জোনে শুরু হয় সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ। ভারী কংক্রিটের চাঁই অত্যন্ত সাবধানে কেটে কেটে অবশেষে বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা নাগাদ মনু কুমারের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন উদ্ধারকারীরা। দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টার নারকীয় বন্দিদশা কাটিয়ে অবশেষে ভোরের আলো দেখেন মনু।
তারাতলার এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ইতিমধ্যেই ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ধরণের বড়সড় ইমারত বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে সময় যত অতিবাহিত হয়, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ততটাই ক্ষীণ হতে থাকে। সেই বৈজ্ঞানিক সত্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মনু যেভাবে ১৪ ঘণ্টা পর বেঁচে ফিরলেন, তা উদ্ধারকাজে যুক্ত সেনা ও এনডিআরএফ কর্মীদেরও চমকে দিয়েছে।
উদ্ধার করার পরপরই মনু কুমারকে গ্রিন করিডোর করে এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন। মনুর দুই বন্ধু সন্তোষ ও বিভূতি বলেন, “১৪ ঘণ্টা ওই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে আটকে থাকার পরও যে মনু মাথা ঠান্ডা রেখে ফোন করার বুদ্ধিটা খাটাতে পেরেছিল, এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। ভগবানের অশেষ কৃপা যে ও আমাদের মাঝে সুস্থ শরীরে ফিরে এসেছে।”
মনুর এই বেঁচে ফেরা দুর্ঘটনাস্থলে কর্মরত উদ্ধারকারীদের মানসিক বল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও প্রাণের স্পন্দন থাকতে পারে। এই কারণে উদ্ধারকাজে আরও বেশি সূক্ষ্মতা ও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে, যাতে বাকি নিখোঁজদেরও অক্ষত অবস্থায় বের করে আনা সম্ভব হয়।
তারাতলার অভিশপ্ত ধ্বংসস্তূপের বুক চিরে মনু কুমারের এই রূপোলী পর্দার মতো বেঁচে ফেরা যেমন আমাদের আশান্বিত করে, তেমনই তাঁর বন্ধুদের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ধারকারীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার যৌথ জয়কে কুর্নিশ জানায়। বিপর্যয়ের এই কালো মেঘের মাঝে মনুর জীবন ফিরে পাওয়ার এই গল্পটি সত্যিই এক পরম আলোর দিশা।






