Mumbai Local Train Murder case: ‘দরজা বন্ধ করতে বলায় অপমানিত বোধ করি’, মুম্বই লোকালে সহযাত্রী ময়ঙ্ককে কুপিয়ে খুনের পর স্বীকারোক্তি ধৃত রোশনের

source : আনন্দবাজার
মুম্বইয়ের লাইফলাইন লোকাল ট্রেনের কামরায় গত মঙ্গলবার রাতে ট্রেনের দরজা খোলা-বন্ধ করা নিয়ে বচসার জেরে এক ২২ বছর বয়সি পোশাক শোরুমের কর্মীকে কুপিয়ে খুনের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল। চার্চগেট-নালাসোপারা ফাস্ট লোকালের প্রথম শ্রেণীর কামরায় ঘটা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর অবশেষে কর্নাটকের বাসিন্দা অভিযুক্ত যুবক রোশন সুবর্ণকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে রেল পুলিশ (GRP)। পুলিশি জেরার মুখে নিজের অপরাধ স্বীকার করার পাশাপাশি কেন সে এই রক্তক্ষয়ী কাণ্ড ঘটাল, তার বিস্ফোরক কারণও খোলসা করেছে অভিযুক্ত।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, নিহত যুবকের নাম ময়ঙ্ক লোহার (২২)। তিনি আন্ধেরির একটি পোশাকের শোরুমে কাজ করতেন এবং কাজ শেষে ভিরারের বাড়িতে ফিরছিলেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত রোশন সুবর্ণ মুম্বই বিমানবন্দরের কার্গো বিভাগে কাজ করে এবং সে মীরা রোড এলাকার বাসিন্দা। মঙ্গলবার রাতে ঘটনার সময় মুম্বইয়ে প্রবল বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। আন্ধেরি স্টেশন থেকে চার্চগেট-নালাসোপারাগামী ফাস্ট লোকালটি ছাড়ার পরই প্রথম শ্রেণীর কামরার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রোশন ও ময়ঙ্কের মধ্যে দরজা নিয়ে বিরোধ বাধে।
বৃষ্টির ছাঁটের কারণে ট্রেনের দরজাটি বন্ধ করা ছিল। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রোশন বারবার সেটি খুলে দিচ্ছিলেন, যার ফলে ভেতরে থাকা যাত্রীরা ভিজে যাচ্ছিলেন। ময়ঙ্ক এবং ট্রেনের অন্যান্য যাত্রীরা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। মনু বার বার দরজা খুললে ময়ঙ্ক এগিয়ে গিয়ে তা বন্ধ করে দিতে থাকেন। এই নিয়ে রোশনের সঙ্গে ময়ঙ্কের তুমুল তর্কাতর্কি শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে কিছু সহযাত্রী মিলে রোশনকে মারধর করেন এবং তাঁকে ট্রেনের অন্য একটি গেটের দিকে পাঠিয়ে দেন।
পুলিশি জেরায় রোশন দাবি করেছে, ট্রেনের কামরায় সকলের সামনে তাকে দরজা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া এবং সহযাত্রীদের একাংশের মারধর সে মেনে নিতে পারেনি। সে চরম অপমানিত ও ক্ষুব্ধ বোধ করছিল। আর এই অপমানের জন্য সে প্রধানত ময়ঙ্ক লোহারকেই দায়ী বলে মনে করে।
ট্রেনটি যখন গোরেগাঁও এবং মালাড স্টেশনের মাঝখান দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটছিল, তখন রোশন নিজের রাগ সামলাতে না পেরে ফের সেই গেটের সামনে ফিরে আসে যেখানে ময়ঙ্ক দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরপর নিজের ব্যাগ থেকে একটি বড় ছুরি বের করে সে সজোরে ময়ঙ্কের বুকে ও পেটে ঢুকিয়ে দেয়। পুলিশ জানতে পেরেছে, এই ছুরিটি রোশন মূলত তাঁর এক বন্ধুর জন্য কিনে নিজের ব্যাগে রেখেছিল, যা সে ময়ঙ্কের ওপর চন্ডাল রাগে ব্যবহার করে। ঘটনার পর বোরিভলি রেল স্টেশনের ৬ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেনটি সম্পূর্ণ থামার আগেই রোশন চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়ে চম্পট দেয়। পরে রক্তাক্ত ময়ঙ্ককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর বোরিভলি জিআরপি (GRP) সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে এবং রোশনের বাবার মোবাইল লোকেশন ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমে তল্লাশি শুরু করে। মুম্বই জুড়ে চিরুনি তল্লাশি চালানোর পর অবশেষে বুধবার পানভেল রেল স্টেশন থেকে রোশন সুবর্ণকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধৃত যুবক মূলত কর্নাটকের ম্যাঙ্গালুরুর বাসিন্দা। খুনের পর সে ট্রেনে চড়ে নিজের রাজ্যে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু তার আগেই পুলিশের জালে ধরা পড়ে যায়।
রেল পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, “অভিযুক্ত রোশন ঘটনার আগে মদ্যপান করেছিল এবং বৃষ্টির কারণে ক্যাব না পেয়ে ট্রেনে উঠেছিল। সহযাত্রীদের দ্বারা হেনস্থা হওয়ার পর সে তীব্র আক্রোশে ময়ঙ্ককে টার্গেট করে। ছুরি মারার পর সে কামরার অন্যান্য যাত্রীদেরও ভয় দেখায় যাতে কেউ এগিয়ে না আসে।” এই মর্মান্তিক ঘটনা মুম্বই লোকাল ট্রেনের যাত্রী নিরাপত্তা এবং তুচ্ছ কারণে তৈরি হওয়া চরম হিংসার মানসিকতাকে আরও একবার বড়সড় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
মুম্বই লোকাল ট্রেনের মতো জনাকীর্ণ গণপরিবহণে সামান্য দরজা বন্ধ করা নিয়ে বচসা কীভাবে খুনের রূপ নিতে পারে, এই ঘটনা তার একটি ভয়ংকর উদাহরণ। লক্ষ লক্ষ নিত্যযাত্রীর নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেনের কামরায় পুলিশি নজরদারি এবং সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যকারিতা বাড়ানো নিয়ে নতুন করে দাবি তুলতে শুরু করেছেন যাত্রী সংগঠনগুলি।
অপমানবোধের করাল গ্রাসে পড়ে রোশন সুবর্ণ নামের যুবকটি ২২ বছরের এক তরতাজা যুবকের জীবন কেড়ে নিল। পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে খুনের মামলা রুজু করেছে। আদালতের মাধ্যমে রোশনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে ট্রেনের কামরায় ঘটে যাওয়া এই আকস্মিক রক্তপাত মুম্বইয়ের নিত্যযাত্রীদের মনে দীর্ঘদিন এক আতঙ্কের ছায়া হয়ে থাকবে।






