Pune Lonavala Lohagad Fort Murder: ‘বসে পড়লেই মারবে ধাক্কা’! প্রেমিককে নিয়ে প্রাক্তনকে ৪০০ ফুট গভীর খাদে ফেলে খুন তরুণীর, পুণেতে রোমহর্ষক ঘটনার পর্দাফাঁস

source : আনন্দবাজার
মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র লোনাভালার লোহাগড় দুর্গে ঘটে যাওয়া এক যুবকের মৃত্যু রহস্যের জট খুলতেই হতবাক তদন্তকারীরা। গত ১৮ জুন দুর্গ থেকে পা পিছলে ৪০০ ফুট গভীর খাদে পড়ে মৃত্যু হয়েছিল কেতন অগ্রবালের। আপাতদৃষ্টিতে একে নিছক দুর্ঘটনা মনে করা হলেও, পুণে পুলিশের গভীর তদন্তে উঠে এসেছে এক রোমহর্ষক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কাহিনী। পুণের ডেপুটি পুলিশ সুপার (DSP) গজানন তোম্পে জানিয়েছেন, কেতনের প্রাক্তন প্রেমিকা সিয়া গয়াল এবং তাঁর নতুন প্রেমিক চেতন চৌধরি দুজনে মিলে নিখুঁত পরিকল্পনা করে কেতনকে পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে খুন করেছেন।
পুলিশি জেরায় ধৃতদের থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, সিয়া অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কেতনকে পাহাড়ের চূড়ায় বেড়ানোর নাম করে নিয়ে যান। লোহাগড় দুর্গের সবচেয়ে নির্জন অংশ ‘ভিঞ্চু কাটা’ নামক জায়গাটিকে এই অপরাধের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে পাভনা বাঁধ খুব সুন্দরভাবে দেখা যায়। সপ্তাহান্তে পর্যটকদের কিছুটা ভিড় থাকলেও, সপ্তাহের মাঝের দিনগুলিতে এই চত্বর সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকে। সেই সুযোগ নিতেই সপ্তাহের কাজের দিনটিকে বেছে নেন সিয়া ও চেতন।
পরিকল্পনামাফিক, ঘটনার সময় সিয়া ও কেতন পাহাড়ের খাদের ধারে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। তাঁদের থেকে বেশ কয়েক হাত দূরে একজন সাধারণ পর্যটকের ছদ্মবেশে দাঁড়িয়ে ছিলেন চেতন, যাতে কেতনের মনে কোনও প্রকার সন্দেহ না জাগে। দুর্গের এক নিরাপত্তারক্ষী পরে পুলিশকে জানান, তিনি চেতনকে ওপরে ওঠার সময় জিজ্ঞাসা করায় চেতন দাবি করেছিলেন তিনি সেখানে শরীরচর্চা বা এক্সারসাইজ করতে এসেছেন। কথা বলার মাঝেই সিয়া দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চেতনকে সঙ্কেত দেন এবং দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থা থেকে হঠাৎ মাটিতে বসে পড়েন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিয়া বসে পড়া মাত্রই চেতন বিদ্যুৎবেগে পিছন থেকে ছুটে এসে কেতনকে ৪০০ ফুট গভীর খাদে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন এবং দুজনে চম্পট দেন।
লোনাভালা গ্রামীণ পুলিশের ইনস্পেক্টর দীনেশ তায়াড়ে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় তাঁর বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। প্রথমে সিয়া পুলিশকে বলেছিলেন যে ছবি তুলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়েছেন কেতন। পরবর্তীতে তিনি বয়ান বদলে দাবি করেন, কেতনকে জলের বোতল দিতে যাওয়ার সময় তিনি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। কিন্তু পুলিশ যখন কেতনের মোবাইলটি উদ্ধার করে তা খতিয়ে দেখে, তখন দেখা যায় ওই দিনের একটি ছবিও মোবাইল ক্যামেরায় তোলা হয়নি। এই তথ্যটিই পুলিশের সন্দেহকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
খুনের ডিজিটাল প্রমাণ: পুলিশ সিয়া ও চেতনের মোবাইল ফোন ঘেঁটে দেখেছে যে, তাঁরা অপরাধ করার আগে লোহাগড় দুর্গ এলাকাটি রেকি করতে এসেছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের ইন্টারনেট সার্চ হিস্ট্রি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, তাঁরা গুগলে সার্চ করেছিলেন— “কোন কৌশলে হত্যা করলে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে মনে হতে পারে?” এবং “কীভাবে পাহাড় থেকে ঠেলে ফেললে পুলিশের চোখে তা নিছক দুর্ঘটনা মনে হবে?”
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতার আঁচ প্রথম পেয়েছিলেন কেতনের বোন। কেতনের মৃত্যুর পর তাঁর মৃতদেহ যখন বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল, তখন সেখানে সিয়াও উপস্থিত হন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, যেখানে কেতনের পরিবারের প্রত্যেকে শোকস্তব্ধ ও কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, সেখানে সিয়ার চোখে-মুখে কোনও শোকের লেশমাত্র ছিল না।
কেতনের বোন সন্দেহবশত সিয়াকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কেন এমন হলো? কিন্তু সিয়া কোনও উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান। সিয়ার এই অস্বাভাবিক ও ভাবলেশহীন আচরণ দেখেই কেতনের বোনের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে যে এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়। এর পরই কেতনের পরিবার পুলিশের কাছে ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানায়।
আজকের ডিজিটাল যুগে অপরাধীরা অপরাধ করার আগে কীভাবে ইন্টারনেট ও সার্চ ইঞ্জিনকে হাতিয়ার করছে এবং সেটিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, এই ঘটনা তার একটি বড় উদাহরণ। তবে প্রযুক্তির এই ব্যবহারের সূত্র ধরেই পুণে পুলিশ ও সাইবার সেল অপরাধীদের ফোনের সার্চ হিস্ট্রি ট্র্যাক করে এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের কিনারা করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রেমের ত্রিভুজ এবং আক্রোশের জেরে লোনাভালার পাহাড়ে এক যুবকের জীবন প্রদীপ অকালে নিভে গেল। সিয়া গয়াল ও চেতন চৌধরি ভেবেছিলেন পাহাড়ের খাদ থেকে ফেলে দিলে প্রমাণ লোপাট করা সহজ হবে এবং পুলিশ একে দুর্ঘটনা বলে ফাইল বন্ধ করে দেবে। কিন্তু কেতনের বোনের তীক্ষ্ণ নজর ও পুণে পুলিশের বিজ্ঞানসম্মত তদন্তের জেরে এই প্রেমিক-প্রেমিকা জুটির নির্মম চক্রান্ত এখন শ্রীঘরের আড়ালে।






