Ayodhya Ram Mandir Donation Scam: রামমন্দিরের কোটি কোটি টাকার প্রণামী চুরি! চম্পত রায়ের গাড়িচালক থেকে অনিল মিশ্রের জামাই— সিটের জালে ধরা পড়া ৮ অভিযুক্তের খুঁটিনাটি পরিচয় ও চাঞ্চল্যকর তথ্য

source : আনন্দবাজার
অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের ভক্তিভরে দেওয়া কোটি কোটি টাকার নগদ অনুদান এবং সোনা-রুপো চুরির ঘটনায় তোলপাড় দেশ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নির্দেশে গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)-এর রিপোর্টের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ ৮ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। এই ঘটনার রেশ এতটাই গভীরে যে, শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায় এবং ট্রাস্টি অনিল মিশ্রকে তড়িঘড়ি পদত্যাগ করতে হয়েছে। ধৃত এই আটজন চুনোপুঁটি হলেও এদের সঙ্গে ট্রাস্টের শীর্ষ রাঘববোয়ালদের যোগসূত্র ছিল অত্যন্ত নিবিড়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেখে নেওয়া যাক, রামলালার দরবারে চুরি করা এই আট অভিযুক্তের আসল পরিচয় কী।
তদন্তকারীদের দাবি, ধৃত ব্যক্তিরা রামমন্দিরের টাকা গোনা, রসিদ দেওয়া এবং ব্যাঙ্কিং প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট বানিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরার নজর এড়িয়ে এই বিপুল অর্থ পাচার করা হতো।
১. রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নু
এই চুরিকাণ্ডের সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রভাবশালী মুখ হলেন টিন্নু। তিনি ট্রাস্টের সদ্য পদত্যাগী সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ের গাড়ির প্রাক্তন চালক এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর করসেবকপুরমের সঙ্গে দীর্ঘকাল যুক্ত ছিলেন। চম্পত রায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে দানবাক্সের চাবি সবসময় টিন্নুর কাছেই থাকত। যদিও টিন্নুর দাবি, তিনি টাকা গোনার কাজে ছিলেন না এবং ঈর্ষান্বিত হয়ে কেউ তাঁর নাম জড়িয়েছে।
২. রমাশঙ্কর মিশ্র ওরফে রবি মিশ্র
তিনি মন্দিরে প্রণামী গণনার মূল দায়িত্বে ছিলেন। ধৃত রবি মিশ্র শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সদ্য পদত্যাগী সদস্য অনিল মিশ্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রণামী পাচারের মূল নীলনকশা তৈরির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিজের ছেলে ও জামাইকেও এই সিন্ডিকেটে ঢুকিয়েছিলেন।
৩. অনুকল্প মিশ্র
অভিযুক্ত রমাশঙ্কর মিশ্রের পুত্র এবং অনিল মিশ্রের আত্মীয়। অনুকল্প দান হিসেবে আসা টাকা ও সোনা গণনার কাজে যুক্ত ছিলেন। সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার নজরদারি আড়াল করে টাকা সরানোর মূল টেকনিক্যাল কাজটি অনুকল্পই করতেন বলে সিটের প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ।
৪. লবকুশ মিশ্র
রমাশঙ্কর মিশ্রের জামাই। তাঁর মূল কাজ ছিল আত্মসাৎ করা কোটি কোটি টাকা এবং সোনাদানা সুরক্ষিতভাবে মন্দিরের বাইরে পাচার করা। তদন্তের স্বার্থে লবকুশের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ইতিমধ্যেই পুলিশ বিপুল পরিমাণ হিসাব-বহির্ভূত নগদ উদ্ধার করেছে।
৫. অবিনাশ শুক্ল
রামমন্দিরের অত্যন্ত প্রভাবশালী সেবাদার বা কর্মচারী। প্রণামীর খাতা এবং অর্থের মূল হিসাবের কারচুপির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পুলিশ অবিনাশের হেফাজত থেকে গোপন সূত্রে তল্লাশি চালিয়ে নগদ ৫ লক্ষ টাকা উদ্ধার করেছে।
৬. মণীশ যাদব
চম্পত রায়ের প্রাক্তন চালক তথা মূল অভিযুক্ত রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নুর আপন ভাইপো। কাকার হাত ধরেই দানবাক্স নজরদারি এবং প্রণামী গণনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন মণীশ। তাঁর বাড়ি থেকেও চুরির লভ্যাংশের টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ।
৭. সুবাস শ্রীবাস্তব
এই সিন্ডিকেটের একমাত্র টেকনিক্যাল সদস্য যিনি একজন প্রাক্তন ব্যাঙ্ক কর্মচারী। উদ্ধার হওয়া নগদ গণনা করা, ট্রাস্টের খাতায় হিসাব মেলানো এবং ব্যাঙ্কে কারচুপি করে টাকা জমা দেওয়ার কাজ সামলাতেন সুবাস।
৮. করুণেশ পাণ্ডে
ভক্তদের দেওয়া প্রণামী অর্থের অফিশিয়াল রসিদ দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন করুণেশ। রসিদের ডুপ্লিকেট বই তৈরি করে এবং রসিদ না দিয়ে টাকা ক্যাশ করার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে।
রসিদ কেলেঙ্কারির প্রমাণ: শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে) নেতা সঞ্জয় রাউত অভিযোগ করেছেন যে, তাঁদের দল রামমন্দিরে ৪ কেজি রুপোর ইট এবং উদ্ধব ঠাকরে ব্যক্তিগতভাবে ১ কোটি টাকা অনুদান দিলেও আজ পর্যন্ত ট্রাস্টের তরফ থেকে কোনও অফিশিয়াল রসিদ মেলেনি।
রামমন্দিরের মতো পবিত্র স্থানে এই কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি সামনে আসতেই সুর চড়িয়েছে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি এবং উদ্ধবসেনার মতো বিরোধী দলগুলি। কংগ্রেসের দাবি, যে ট্রাস্টের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ, তাদেরই দায়ের করা এফআইআর (FIR)-এর ভিত্তিতে তদন্ত হচ্ছে! এতে আসল অপরাধীরা আড়ালেই থেকে যাবে।
বিরোধীদের দাবি, কেবল চম্পত রায় বা অনিল মিশ্রের পদত্যাগই যথেষ্ট নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দফতরের প্রাক্তন কর্তা তথা রামমন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান নৃপেন্দ্র মিশ্রের বিরুদ্ধেও সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে (Supreme Court Monitored Probe) উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সঞ্জয় রাউতের বিস্ফোরক অভিযোগ, রামমন্দির থেকে চুরি করা প্রায় ২০০০ কোটি টাকা দিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে বিরোধী সাংসদ ও বিধায়ক ভাঙানোর নোংরা রাজনীতি করা হয়েছে।
রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ভক্ত কোটি কোটি টাকা দান করছেন অযোধ্যায়। সেই পবিত্র অর্থ এভাবে ট্রাস্টের ভেতরের লোকজনের হাত ধরে চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশের কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর আবেগে বড় ধাক্কা দিয়েছে। যোগী সরকারের ‘সিট’ আপাতত আটজনকে গ্রেফতার করলেও, এই সিন্ডিকেটের জাল দিল্লির দরবার পর্যন্ত বিস্তৃত কি না, সেটাই এখন দেখার।






