সিরিয়ার ভয়াল ‘জেহাদি জন’-এর ছায়া বাংলায়! সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্রেনওয়াশ থেকে এনক্রিপ্টেড চ্যাটে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানার ছক

গ্রেপ্তার জঙ্গি হামিম। অন্যদিকে, আইএস জঙ্গি জেহাদি জন।
আইএসআইএস (ISIS)-এর সেই ভয়ঙ্কর জল্লাদ ‘জেহাদি জন’-এর কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে, যার আসল নাম ছিল মহম্মদ এমওয়াজি। কুয়েতে জন্ম ও লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা করা এই তরুণকে ডার্ক ওয়েভ ও এনক্রিপ্টেড চ্যাটের মাধ্যমে কট্টরপন্থী বানিয়ে সিরিয়ার জল্লাদে রূপ দিয়েছিল ইসলামিক স্টেট। ঠিক এক দশক পর, বাংলায় গ্রেপ্তার হওয়া জইশ-ই-মহম্মদ জঙ্গি হামিম মণ্ডলের অপরাধের মোডাস অপারেন্ডি (Modus Operandi) খতিয়ে দেখে সেই একই ভয়াল আন্তর্জাতিক ধাঁচ খুঁজে পাচ্ছেন রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (STF) দুঁদে গোয়েন্দারা।
কীভাবে ইতিহাসের পাতায় ত্রাস হয়েছিল ‘জেহাদি জন’?
২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (IS) নৃশংসতার মুখ হয়ে উঠেছিল ‘জেহাদি জন’।
- উচ্চশিক্ষিত যুবক থেকে জঙ্গি: লন্ডনে বেড়ে ওঠা এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও ইমেল ও ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে আইএসের কট্টরপন্থীদের সংস্পর্শে আসে সে।
- মগজধোলাইয়ের পরিণতি: ২০১৩ সালে সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দেয় এবং ব্রিটিশ ও আমেরিকান পণ বন্দিদের শিরচ্ছেদের রোমহর্ষক ভিডিয়োতে মূল রূপকার হিসেবে তাকে দেখা যেত।
- নেটওয়ার্ক গঠন: সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে ব্রিটেনের একাধিক মুসলিম যুবককে জঙ্গি দলে টানে সে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে সিরিয়ার রাক্কায় এক মার্কিন ড্রোন হামলায় জেহাদি জনের মৃত্যু হয়।
[জেহাদি জন বনাম জইশ জঙ্গি হামিম: মিল কোথায়?]
১. শিকার: উভয়েই উচ্চ প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মগজধোলাইয়ের শিকার।
২. যোগাযোগ মাধ্যম: ডার্ক ওয়েব, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম ও সিক্রেট এনক্রিপ্টেড কোড।
৩. ভূমিকা: হ্যান্ডলারদের নির্দেশে ভিআইপি রেইকি ও নতুন যুবক রিক্রুট করা।
৪. লক্ষ্য: বড়সড় নাশকতার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বা দেশে ভয় ও চাঞ্চল্য ছড়ানো।
হামিম মণ্ডলের কেসে ‘ডিজিটাল ব্রেনওয়াশ’-এর জলজ্যান্ত প্রমাণ
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বর্ধমানের অভিজাত রেনেসাঁ টাওয়ারের জিম থেকে হাতেনাতে পাকড়াও করা হয় হামিম মণ্ডলকে। এসটিএফ আইজি গৌরব শর্মা জানান, অতি সাধারণ ঘরের এই যুবককে এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে ধীরে ধীরে কট্টরপন্থীতে রূপান্তরিত করেছিল পাকিস্তানের ‘শেহজাদ ভাট্টি’ গ্যাং।
- পাক হ্যান্ডলারদের সঙ্গে কোডেড মেসেজ: ইনস্টাগ্রামে ‘রানা’, ‘উজায়ের’-সহ বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট ফলো করত সে। বার্তা চালাচালির জন্য তারা জটিল এনক্রিপ্টেড কোড ব্যবহার করত।
- মগজধোলাইয়ের মাস্টারপ্ল্যান: অনলাইন বার্তার মাধ্যমে ভারতের যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করা এবং দলভারী করাই ছিল হামিমের কাজ।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ওপর বিপজ্জনক নজরদারি
জেহাদি জন যেমন বিদেশি পণবন্দিদের নিশানা বানাত, তেমনই সীমান্ত পারের নির্দেশে হামিমের টাস্ক ছিল পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে টার্গেট করা।
মুখ্যমন্ত্রী সারাদিন কোথায় যাচ্ছেন, তাঁর যাতায়াতের সময়সীমা কত এবং ঠিক কোন মুহূর্তে তাঁর নিরাপত্তা বা সিকিউরিটি কভার খানিকটা ঢিলে থাকে— সেই ‘আনগার্ডেড স্পট’ খুঁজে বের করে পাকিস্তানের হ্যান্ডলারদের পাঠাত হামিম। উদ্দেশ্য ছিল বড়সড় হামলার নির্ভুল ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করা।
এক নজরে জেহাদি জন ও হামিম মণ্ডলের তুলনা:
| বিষয় | জেহাদি জন (মহম্মদ এমওয়াজি) | হামিম মণ্ডল (জইশ-ই-মহম্মদ) |
| শিক্ষাগত ও টেক ব্যাকগ্রাউন্ড | কম্পিউটার সায়েন্স (লন্ডন) | ডিজিটাল ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে দক্ষ |
| যোগাযোগের মাধ্যম | ইমেল, ডার্ক ওয়েব ও এনক্রিপ্টেড চ্যাট | ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম ও এনক্রিপ্টেড কোড |
| সংগঠন | ইসলামিক স্টেট (ISIS) | জইশ-ই-মহম্মদ (শেহজাদ ভাট্টি গ্যাং) |
| মূল অপারেশন | পণ বন্দি হত্যা ও আন্তর্জাতিক রিক্রুটমেন্ট | মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রেইকি ও হানিট্র্যাপ ছক |
ইন্টারনেটের এনক্রিপ্টেড দুনিয়াকে হাতিয়ার করে তরুণদের ব্রেনওয়াশ করার এই আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড ভারতের নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। জেহাদি জনের পরিণতি থেকে পাঠ নিয়ে, বাংলায় বিস্তৃত এই ডিজিটাল জঙ্গি মডিউলের সমস্ত রুট ও শেকড় উপড়ে ফেলতে এখন এনআইএ (NIA) ও এসটিএফের যৌথ নজরদারি জারি রয়েছে।






