Baruipur Horror: ‘জ্যান্ত অবস্থাতেই বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলা হয়!’ বারুইপুর কাণ্ডে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে নৃশংসতার চরম রূপ, কাল নির্যাতিতার পরিবারে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

source : সংবাদ প্রতিদিন
বারুইপুরের সূর্যপুরে ষষ্ঠ শ্রেণীর এক নাবালিকাকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তোলপাড় গোটা রাজ্য। রবিবারের ক্ষোভ, বিক্ষোভ আর অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির পর সোমবার প্রকাশ্যে এসেছে প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, যা তিলোত্তমার স্মৃতি উসকে দেওয়ার পাশাপাশি নৃশংসতার সব সীমা পার করে গেছে। তবে পূর্বতন সরকারের মতো এবার আর তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা বা তথ্য গোপনের চেষ্টা দেখেনি রাজ্যবাসী। নতুন সরকারের পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল অভিযুক্তকে খাঁচায় পুরেছে। এই আবহে আগামীকাল অর্থাৎ মঙ্গলবার নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে বারুইপুরের সূর্যপুরে যাচ্ছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (CM Suvendu Adhikari)।
‘জলে ডুবেই মৃত্যু!’ ময়নাতদন্তের রিপোর্টে নৃশংসতার হাড়হিম বিবরণ
তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত পাশবিক। রিপোর্ট অনুযায়ী, মেয়েটির ওপর চরম শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তার শরীরে একাধিক কামড় ও আঁচড়ের দাগ রয়েছে। এরপর তার মাথায় কোনও ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত বা শক্ত জায়গায় মাথা ঠুকে দেওয়া হয়।
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, মাথায় গুরুতর আঘাতের পরও মেয়েটি বেঁচে ছিল। সেই সংজ্ঞাহীন বা অর্ধচেতন অবস্থাতেই তাকে বস্তাবন্দি করে জীবন্ত অবস্থায় পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জলের নিচে থাকায় ফুসফুস এবং পাকস্থলীতে জল ঢুকে ফুলে যায় এবং মাথার ক্ষত থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের পাশাপাশি মূলত জলে ডুবেই দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে ওই নাবালিকার।
“শয়তানগুলোও যেন আমার বাচ্চার মতোই কষ্ট পায়”, সিসিটিভি দেখে কান্না মায়ের
এদিন সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সিসিটিভি ফুটেজের ভয়ঙ্কর দৃশ্যের কথা জানান নির্যাতিতার মা। তিনি বলেন,
“ফুটেজে দেখেছি, মেয়েকে ওরা হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। বাচ্চার হাতে খাবার ছিল। প্লাস্টিকে কী ছিল, বুঝতে পারিনি। ওরাই হয়তো কিনে দিয়েছিল। হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, এটুকুই দেখা গিয়েছে।”
খুনিদের ফাঁসি বা চরম শাস্তির দাবি জানিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া মা বলেন, “আমার বাচ্চা যেভাবে কষ্ট পেয়ে পেয়ে মারা গিয়েছে, শয়তানগুলোও যেন সেরকমই কষ্ট পায়। আর খুব তাড়াতাড়ি যেন ওরা শাস্তি পায়।”
আগের সরকারের জমানাকে তোপ, নতুন সরকারের ওপর আস্থা
বিচারের দাবিতে যখন বিরোধী দলগুলি রাজনীতি করার চেষ্টা করছে, তখন খোদ নির্যাতিতার পরিবার স্পষ্ট বার্তা দিল বর্তমান প্রশাসনের পক্ষে। বিগত তৃণমূল সরকারের জমানার দিকে ইঙ্গিত করে মৃতা নাবালিকার মা বলেন,
“এর আগেও রাজ্যে অনেক ঘটনা ঘটেছে। আগের সরকারের আমলে কোনওদিন কাউকে বিচার পেতে দেখিনি। এবার নতুন সরকার এসেছে। আমাদের আশা রাখি বিচারটা দ্রুত পাব।”
উল্লেখ্য, ঘটনার পর পরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ ফাঁসির সাজা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
[বারুইপুর কাণ্ডে প্রশাসনের অ্যাকশন টাইমলাইন]
* শনিবার সন্ধ্যা: বান্ধবীর জন্মদিনের উপহার কিনতে গিয়ে নিখোঁজ হয় ১২ বছরের কিশোরী।
* রবিবার সকাল: পুকুর থেকে বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার, গণবিক্ষোভ, ৪টি FIR দায়ের।
* সোমবার: ৬ সদস্যের সিট (SIT) গঠন, STF ও SOG-এর যৌথ অভিযানে মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারসহ ৩ জন গ্রেপ্তার, ৩ জন আটক।
* মঙ্গলবার (আগামীকাল): মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সশরীরে নির্যাতিতার বাড়িতে পরিদর্শন।
সূর্যপুরে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী, কড়া বার্তা অশান্তি সৃষ্টিকারীদের
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোমবারই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নারী সুরক্ষায় তাঁর সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে চলবে। মঙ্গলবার তিনি নিজে সূর্যপুরে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করবেন। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রবিবার যে গণপিটুনি (এক সন্দেহভাজনের মৃত্যু) এবং রেল ও পুলিশ গাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, তার পেছনে ‘পরাজিত রাজনৈতিক শক্তি’র উসকানি রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, যারা এই ঘটনার সুযোগ নিয়ে এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা নষ্ট করেছে, তাদেরও রেয়াত করা হবে না। বর্তমানে বারুইপুর, নরেন্দ্রপুর ও সোনারপুর থানা এলাকায় সুরক্ষার্থে ১৬৩ ধারা (কারফিউ) জারি রয়েছে।
এক নজরে বারুইপুর কাণ্ডের বর্তমান পরিস্থিতি:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বর্তমান তথ্য ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ |
| মূল অভিযুক্ত | আনন্দ সর্দার (গ্রেপ্তার), এছাড়া প্রভাস মণ্ডল ও দিবাকর সর্দারও ধৃত। |
| তদন্তকারী দল | আইজি (Presidency Range)-র অধীনে ৬ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) এবং STF। |
| আইনি ধারা ও মামলা | মোট ৪টি FIR (ধর্ষণ-খুন, গণপিটুনি, পুলিশ ও সিআরপিএফ-এর ওপর হামলা এবং রেল অবরোধ)। |
| সরকারি সাহায্য ও আশ্বাস | মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরাসরি তদারকি, দ্রুত চার্জশিট পেশ ও মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানানোর আশ্বাস। |
২০২৪-এর আর জি কর কাণ্ডের পর বাংলার মানুষ যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেখেছিল, ২০২৬-এর নতুন সরকারের আমলে বারুইপুর কাণ্ডে প্রশাসনের তড়িৎকর্মা পদক্ষেপ তা বদলানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের শ্রীঘরে পাঠানো এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা— প্রশাসনের এই রূপই হয়তো নির্যাতিতার পরিবারকে বিচারের আলো দেখাচ্ছে। এখন দেখার, ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে কত দ্রুত দোষীদের ফাঁসির মঞ্চে ঝোলানো সম্ভব হয়।






