পরপর চার সন্তানকে হারানোর পর পঞ্চম সন্তানেরও মৃত্যু! ছানাটিকে পিঠে নিয়ে ৬ দিন ভারত মহাসাগরে ঘুরল মা ডলফিন ‘ফ্র্যাগল’

সন্তান হারানোর যন্ত্রণা তা সে মানুষের ক্ষেত্রে হোক কিংবা বন্যপ্রাণীর— অনুভূতিটা একই রকম বেদনাদায়ক। চোখের সামনে নিজের ছানাকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে দেখে সেই নির্মম সত্য মেনে নিতে পারেনি এক মা ডলফিন। নিজের খাবার বা বিশ্রামের কথা ভুলে মৃত সন্তানকে পিঠে চাপিয়ে টানা ৬ দিন ধরে ভারত মহাসাগরের নোনা জলে ভেসে বেড়িয়েছে সে। ড্রোন ক্যামেরায় বন্দি হওয়া সেই করুণ ও হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না নেটিজেনরা।
পর পর চার সন্তানকে হারিয়েছিল ‘ফ্র্যাগল’
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ভারত মহাসাগর সংলগ্ন উপকূলের বাসিন্দা এই ডলফিনটির নাম গবেষকরা রেখেছেন ‘ফ্র্যাগল’ (Fraggle)। ফ্র্যাগলের মাতৃজীবন ছিল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ইতিপূর্বে তার চারটি সন্তানই জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রাণ হারিয়েছিল।
পঞ্চম সন্তানটি জন্ম নেওয়ার পর চিকিৎসকদের আশার আলো দেখালেও, মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং সেটিরও মৃত্যু হয়। চোখের সামনে নিজের শেষ সন্তানকে এভাবে হারিয়ে শোকের সাগরে তলিয়ে যায় মা ফ্র্যাগল।
[মা ডলফিন ফ্র্যাগল ও তার শোকের বিবরণী]
* মা ডলফিনের নাম: ফ্র্যাগল (Fraggle)।
* স্থান: পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া, ভারত মহাসাগর চত্বর।
* সন্তান মৃত্যুর পটভূমি: প্রথম ৪টি সন্তান জন্মের পরই মৃত, ৫ম সন্তান ২ সপ্তাহ বয়সে মৃত।
* শোকপ্রকাশের সময়কাল: টানা ৬ দিন ধরে মৃত ছানাকে পিঠে বয়ে বেড়ানো।
* ডলফিন দলের সদস্য: সঙ্গী হিসেবে ছিল দলের আরও ১৪টি ডলফিন।
* পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা: জিওগ্রাফ মেরিন রিসার্চ লিমিটেড (Geographe Marine Research Ltd)।
খাদ্যাভ্যাস ভুলে ৬ দিনের দীর্ঘ করুণ সফর
সন্তানের মৃত্যুর পর ফ্র্যাগল নিজের খাদ্যের সন্ধান বা স্বাভাবিক জীবনযাপন বন্ধ করে দেয়। মৃত ছানাটি যাতে সমুদ্রের তলে তলিয়ে না যায়, তার জন্য সেটিকে নিজের পিঠ ও মাথার ওপর ব্যালেন্স করে ভাসিয়ে রাখে। এভাবে সমুদ্রের বুকে প্রায় ৬ দিন ঘুরে বেড়ায় সে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কঠিন বিপদে মা ডলফিন একা ছিল না। ফ্র্যাগলের এই গভীর শোকের সমব্যথী হয়ে তার দলভুক্ত আরও ১৪টি ডলফিন পুরো সময় তার চারপাশে জলকেলি না করে নীরবে পাহারা দিয়ে ভেসে বেড়ায়।
কী বলছেন সামুদ্রিক গবেষকরা?
দৃশ্যটি নজর কাড়ে ‘জিওগ্রাফ মেরিন রিসার্চ লিমিটেড’-এর গবেষকদের। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডলফিন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং গভীর সামাজিক পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকা প্রাণী।
গবেষকরা জানান, ডলফিনদের আবেগ এবং শোকপ্রকাশের ক্ষমতা স্থলভাগের অনেক প্রাণীর চেয়ে বহুগুণ বেশি। বিশেষ করে মা ও ছানার মধ্যকার নাড়ির টান এতটাই নিবিড় যে, সন্তান মারা যাওয়ার পরও বেশ কিছুদিন তারা সেটিকে মৃত বলে মানতে চায় না এবং কাছে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়।
এক নজরে ঘটনাটি:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| মা ডলফিনের নাম | ফ্র্যাগল (Fraggle) |
| ঘটনার স্থান | পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া সংলগ্ন ভারত মহাসাগর |
| ঘটনাবলী | মৃত ছানাকে পিঠে নিয়ে ৬ দিন ধরে ভেসে থাকা |
| সঙ্গী ডলফিন | ডলফিন পরিবারের ১৪ জন সদস্য |
| গবেষক সংস্থা | জিওগ্রাফ মেরিন রিসার্চ লিমিটেড |
ফ্র্যাগলের এই মর্মস্পর্শী আচরণ আরও একবার প্রমাণ করে দিল যে, ভাষা বা প্রজাতির পার্থক্য থাকলেও মাতৃস্নেহের কোনো সীমানা হয় না। নিজের অস্তিত্ব ভুলে মৃত সন্তানকে আঁকড়ে ধরে রাখার এই আকুলতা নেটদুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে গিয়েছে।






