Child Marriage Prevention: এক-দুই নয়, ৫১টি বাল্যবিবাহ রুখে ‘হাফ সেঞ্চুরি’ দুর্গাপুরের শিল্পী পালের! ছাদনাতলা থেকে মেয়েদের উদ্ধার করে ‘দশভুজা’ দিদিমণি

source : sangbad pratidin
আইন অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর হলেও, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি বাল্যবিবাহের অভিশাপ। কিন্তু এই ‘অসুখ’ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন এক সাধারণ নারী। তিনি দুর্গাপুরের বীরভানপুরের বাসিন্দা শিল্পী পাল (Shilpi Pal)। এলাকায় সবাই তাঁকে একডাকে চেনে ‘দিদিমণি’ নামে। গত এক দশকে দুর্গাপুর, মুচিপাড়া, জেমুয়া, আড়া, কাঁকসা জুড়ে এক বা দুই নয়, মোট ৫১টি নাবালিকা বিবাহ রুখে দিয়ে সমাজসেবায় অনন্য ‘হাফ সেঞ্চুরি’র নজির গড়েছেন এই লড়াকু নারী।
ক্লাস এইটের মৌসুমী থেকে শুরু হয়েছিল লড়াই
১০ বছর আগের সেই দিনটার কথা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে শিল্পীর। দুর্গাপুরের এক স্কুলের শিক্ষিকার ফোন পেয়ে সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। ক্লাস এইটের এক ছাত্রী বাংলা ক্লাসে অঝোরে কাঁদছিল। কারণ জানতে চাওয়ায় জানা যায়, দিনমজুর বাবার অভাবের সংসারে ৪ ভাইবোনের মধ্যে বড় হওয়ায় তাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মেয়েটি পড়তে চায়।
খবর পেয়েই শিল্পী পাল আর এক মুহূর্তও নষ্ট করেননি। থানা-পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে সেই বিয়ে রুখে দেন তিনি। বাবার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয় যে ১৮ বছরের আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়া হবে না। সেই মৌসুমী আজ অন্ধকার পেরিয়ে ডানা মেলেছে—সে এখন এক নামী বেসরকারি হাসপাতালের নার্স। মৌসুমীর মতোই শিল্পীর হাত ধরে রক্ষা পাওয়া বহু মেয়ে আজ কেউ উচ্চশিক্ষায় ব্যস্ত, কেউ চাকরি করছেন, আবার কেউ পড়াশোনা শেষ করে নিজের ইচ্ছেয় সাবালিকা হয়ে সংসার পেতেছেন।
রণক্ষেত্রে ‘দশভুজা’: গণধোলাইয়ের ভয়ও দমাতে পারেনি
শিল্পীর এই পথটা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ছাদনাতলায় গিয়ে বিয়ে ভেঙে দেওয়া সহজ কথা নয়। বহুবার পরিবার ও সমাজের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। তিন বছর আগে জেমুয়া গ্রামের এক ঘটনা মনে করলে আজও শিউরে উঠতে হয়। বিয়ের দিনই খবর পেয়ে পুলিশ নিয়ে কনের বাড়ি হাজির হয়েছিলেন শিল্পী।
মেয়ের বিয়ে বন্ধ হচ্ছে দেখে খেপে লাল হয়ে যায় গোটা গ্রাম। শিল্পী ও পুলিশ বাহিনীকে ঘিরে ধরে কার্যত গণধোলাইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত ছিল যে পুলিশও হাল ছেড়ে দেওয়ার জোগাড়। শেষমেশ ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসেন কনের স্কুলের প্রধান শিক্ষক, যাঁকে গ্রামবাসীরা খুব মানতেন। তাঁর হস্তক্ষেপে সে যাত্রা রক্ষা পান শিল্পী এবং বিয়েটি বন্ধ হয়। শিল্পীর কথায়—
“বাধাবিপত্তি অনেক আসবে। কিন্তু আইনই আমার আসল হাতিয়ার আর প্রশাসন আমার চিরসাথী। শেষ মুহূর্তে খবর এলেও আমি এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করি না। একটা মেয়ের জীবন বাঁচানো মানে একটা পরিবারকে আলোর পথ দেখানো।”
[শিল্পী পালের সমাজসেবার খতিয়ান]
* রুখে দেওয়া বাল্যবিবাহের সংখ্যা: ৫১টি (হাফ সেঞ্চুরি সম্পন্ন)।
* কর্মক্ষেত্র: দুর্গাপুর, মুচিপাড়া, জেমুয়া, আড়া, কাঁকসা ও সংলগ্ন এলাকা।
* হাতিয়ার: ভারতীয় আইন, পুলিশ প্রশাসন এবং সামাজিক সচেতনতা।
* অন্যান্য কাজ: ৮টি অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ সনাক্ত করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া।
মৃতদেহের পরিচয় উদ্ধারেও মানবিক মুখ
শুধু জীবন্ত মেয়েদের জীবন বাঁচানোই নয়, মৃতদের প্রতিও সমান দায়বদ্ধ শিল্পী পাল। কোনো এক সময় রেললাইনে উদ্ধার হওয়া একটি অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহের পরিচয় উদ্ধার করে তাঁর স্বজনদের হাতে তুলে দিতে পুলিশকে সাহায্য করেছিলেন তিনি। সেই শুরু, তারপর থেকে নিজের তাগিদেই এ পর্যন্ত ৮ জন অজ্ঞাতপরিচয় মৃতের পরিবারকে খুঁজে বের করে মৃতদেহ সৎকার করার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। দিন হোক বা রাত, ঝড়-জল হোক বা কড়া রোদ—দুর্গাপুর তল্লাটে যেকোনো বিপদে মানুষ আজ ‘দশভুজা’ রূপী শিল্পী পালের কথাই স্মরণ করেন।
শিল্পী পাল প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, সমাজকে বদলাতে কোনো বড় রাজনৈতিক ক্ষমতা বা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না, শুধু প্রয়োজন একটি ইস্পাতকঠিন মানসিকতা ও সদিচ্ছার। যে বাংলায় আজও ‘রূপশ্রী’ বা ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্পের পাশাপাশি বাল্যবিবাহের মতো ব্যাধি লুকিয়ে রয়েছে, সেখানে শিল্পী পালের মতো ‘দশভুজা’রাই সমাজের আসল সম্পদ। ৫১টি নাবালিকার জীবনকে বিপথ থেকে পথে ফিরিয়ে আনা এই অনন্য ‘শিল্পী’র লড়াইকে আজ কুর্নিশ জানাচ্ছে গোটা দুর্গাপুর তথা সমগ্র রাজ্যবাসী।






