প্রয়াত সাবেক প্রধান বিচারপতি মনমোহন সিং লিবেরহান, বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার ঐতিহাসিক তদন্ত কমিশনের শীর্ষে ছিলেন তিনি

স্বাধীন ভারতের অন্যতম ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল তদন্তের কাণ্ডারি সাবেক প্রধান বিচারপতি মনমোহন সিং লিবেরহান (Manmohan Singh Liberhan) আর নেই। ৮৭ বছর বয়সে রবিবার তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রোহিত সুদ ও সংবাদ সংস্থা পিটিআই সূত্রে এই দুঃখজনক খবর জানা গেছে। মাদ্রাজ ও অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংস সংক্রান্ত লিবেরহান কমিশনের প্রধান হিসেবেই তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
আইনি জীবনের সূচনা ও শীর্ষ পদে আরোহণ
১৯৩৯ সালের নভেম্বরে জন্মগ্রহণ করা মনমোহন সিং লিবেরহান ১৯৬৪ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্টে নিজের আইনি কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে তিনি পাঞ্জাব ও হরিয়ানা বার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৭ সালে তিনি পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্টের বিচারপতি হিসেবে উন্নীত হন। এর পর ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে তিনি মাদ্রাজ হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির পদে বসেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি অন্ধ্রপ্রদেশ হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি হন এবং ২০০০ সালে অবসরগ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত সেখানেই দায়িত্বে ছিলেন।
[বিচারপতি লিবেরহানের আইনি যাত্রাপথ]
* ১৯৬৪: পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস শুরু।
* ১৯৮৭: পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ।
* ১৯৯৭: মাদ্রাজ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি।
* ১৯৯৮: অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি।
* ১৯৯২-২০০৯: বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তদন্তকারী 'লিবেরহান কমিশন'-এর নেতৃত্ব।
লিবেরহান কমিশন ও ১৭ বছরের দীর্ঘতম তদন্ত
সাধারণ দেশবাসীর কাছে বিচারপতি লিবেরহানের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তদন্তে গঠিত ‘লিবেরহান কমিশন’ (Liberhan Commission)। ঘটনা ঘটার ঠিক ১০ দিন পর তৎকালীন পিভি নরসিমহা রাও সরকার তাঁকে নিয়ে গঠিত এক সদস্যের কমিশনের দায়িত্ব দেয়।
প্রাথমিকভাবে ৩ মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ১০০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও ৩১৫টি শুনানির কারণে রিপোর্ট জমা পড়তে দীর্ঘ ১৭ বছর সময় লাগে। অবশেষে ২০০৯ সালের ৩০ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে নিজের ১৭ পাতার রিপোর্ট জমা দেন তিনি।
বাবরি রিপোর্ট ও ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ
নিজের ঐতিহাসিক রিপোর্টে বিচারপতি লিবেরহান উল্লেখ করেন, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় দেড় লক্ষেরও বেশি করসেবকের উপস্থিতি কোনো ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল একটি ‘পূর্ব-পরিকল্পিত’ ষড়যন্ত্র। রিপোর্টে এল কে আডবাণী, অটলবিহারী বাজপেয়ী, তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং, মুরলি মনোহর জোশীর মতো সিনিয়র বিজেপি নেতাদের দায়ী করা হয়েছিল।
যদিও দীর্ঘ দিন পর, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে লখনউয়ের একটি বিশেষ সিবিআই আদালত প্রমাণের অভাবে অভিযুক্ত ৩২ জন জীবিত ব্যক্তিকেই বেকসুর খালাস দেয়, তবুও স্বাধীন ভারতের আইনি ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও তাৎপর্যপূর্ণ কমিশন হিসেবে লিবেরহান কমিশনের নাম নথিভুক্ত হয়ে থাকবে।
এক নজরে বিচারপতি মনমোহন সিং লিবেরহান:
| বিষয় | তথ্য / বিবরণ |
| জন্ম | নভেম্বর, ১৯৩৯ |
| প্রয়াণ | আগস্ট, ২০২৬ (৮৭ বছর বয়সে) |
| গুরুত্বপূর্ণ পদ | প্রধান বিচারপতি (মাদ্রাজ ও অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্ট) |
| ঐতিহাসিক কাজ | বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার ‘লিবেরহান কমিশন’-এর প্রধান |
| রিপোর্ট পেশ | ৩০ জুন, ২০০৯ (১৭ বছর পর) |
অবসরগ্রহণের পর থেকে বিচারপতি লিবেরহান সর্বদা প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করতেন। নিজের দেওয়া কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে পরবর্তীতে তিনি খুব কমই মুখ খুলেছেন। তবে ভারতের বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের নিরপেক্ষ তদন্তের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।






