নেপালকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ঘোষণার দাবিতে চরম উত্তাপ! ওপার বাংলায় রোহিঙ্গা-বাংলাদেশি বিতাড়নের দাবিতে অশান্তি, ভারত সীমান্তে জারি ‘হাই অ্যালার্ট’

প্রতিবেশী দেশ নেপালে নতুন করে তীব্র ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দানা বেঁধেছে। নেপালকে পুনরায় ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ঘোষণা এবং দেশে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বিতাড়নের দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসছে আমজনতা ও বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন। ২৬ জুলাই থেকে ছড়িয়ে পড়া গোষ্ঠী সংঘর্ষের জেরে নেপালের তরাই অঞ্চলের একাধিক স্থানে কার্ফু জারি করতে হয়েছে। এই অশান্তির সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীরা যাতে ভারতে ঢুকে আত্মগোপন করতে না পারে, সেজন্য পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও সিকিম সংলগ্ন ভারত-নেপাল সীমান্তে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘হাই অ্যালার্ট’।
হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা ও ১৫ দফা দাবির আন্দোলনে উত্তাল নেপাল
নেপালের দেওয়ানগঞ্জ ও সুনসারি জেলায় ঘটা সাম্প্রতিক হিংসাত্মক ঘটনার পর থেকেই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে দেশটির একাধিক হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠী। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি হলো— নেপালকে অবিলম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং এর প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করতে হবে।
এরই সঙ্গে সুনসারিতে ঘটে যাওয়া হিংসার নিরপেক্ষ তদন্ত, ঘটনায় যুক্তদের গ্রেপ্তার, গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেওয়া আধিকারিকদের নাম প্রকাশ এবং সংঘর্ষে নিহতদের ‘শহিদ’ মর্যাদা ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে ১৫ দফা দাবি সনদ পেশ করা হয়েছে।
[নেপাল বিতর্ক ও ভারত সীমান্তের পরিস্থিতি]
* আন্দোলনের মূল কেন্দ্র: নেপালকে পুনরায় 'হিন্দু রাষ্ট্র' ঘোষণা।
* দ্বিতীয় বড় দাবি: অবৈধ রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়ন।
* কার্ফু এলাকা: সুনসারি, সপ্তরি, ও ধরসা অঞ্চল (নেপাল তরাই)।
* ভারতীয় সীমান্ত এলাকা: পশ্চিমবঙ্গ (দার্জিলিং), বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও সিকিম সীমান্ত।
* কড়াকড়ি: বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া সীমান্ত পারাপার ও চলাচলে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা।
চাপে বালেন শাহ সরকার: ক্ষোভের মুখে জনপ্রতিনিধিরা
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নেপালে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নাগরিকেরা দেশের জনবিন্যাস পাল্টে দিচ্ছে। এর ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক অশান্তি।
অনুপ্রবেশকারীদের দেশ থেকে খেদানোর দাবিতে সাধারণ মানুষ জনপ্রতিনিধিদের ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। সিরাহা জেলায় ন্যাশনাল ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টির সাংসদ বাবলু গুপ্তা সম্প্রতি ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে বালেন শাহ সরকার।
ভারত-নেপাল সীমান্তে ‘হাই অ্যালার্ট’ ও নাকা চেকিং
নেপালের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া এই সাম্প্রদায়িক উত্তাপ ও সহিংসতার প্রভাব যাতে কোনোভাবেই ভারতের মাটিতে না পড়ে, তার জন্য তৎপর হয়েছে ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনী।
উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং সীমান্ত ছাড়াও বিহার ও উত্তরপ্রদেশ সংলগ্ন সীমানায় কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, নেপালের এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ভারতবিরোধী জঙ্গি সংগঠনগুলি এ দেশে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে। সেই আশঙ্কায়—
- বৈধ সচিত্র পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে সীমান্ত পার হতে দেওয়া হচ্ছে না।
- আন্তর্জাতিক রুটে চলা যানবাহনগুলিতে চালানো হচ্ছে চিরুনি তল্লাশি।
- সীমান্ত সংলগ্ন নাকা পয়েন্টগুলিতে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে।
এক নজরে নেপালের আন্দোলন ও সীমান্তের বর্তমান চিত্র:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| আন্দোলনের মূল বিষয় | নেপালকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ঘোষণা ও অনুপ্রবেশকারী তাড়ানো |
| প্রভাবিত এলাকা (নেপাল) | সুনসারি, সপ্তরি, সিরাহা ও ধরসা জেলা |
| রাজনৈতিক সংকট | জনপ্রতিনিধিদের ঘেরাও, চাপে বালেন শাহ প্রশাসন |
| কড়া নজরদারিতে ভারতীয় সীমান্ত | দার্জিলিং (পশ্চিমবঙ্গ), সিকিম, বিহার ও উত্তরপ্রদেশ |
| নিরাপত্তা ব্যবস্থা | সচিত্র পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক, সীমান্তে নাকা তল্লাশি ও হাই অ্যালার্ট |
নেপালের অভ্যন্তরীণ সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় কার্ফু ও হিন্দু রাষ্ট্রের দাবিতে চলা সহিংস আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। ভারতের সীমান্ত সুরক্ষাবাহিনী যেভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তাতে নেপালের অসন্তোষের আঁচ ভারতের ভূখণ্ডে ছড়াতে বাধা দেবে বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।






