তিন মেয়েকেই নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছিলেন বৃদ্ধ বাবা! শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ বৃদ্ধাশ্রমে, ভিডিও কলে শেষকৃত্য দেখে ৫১০০ টাকায় দায় সারলেন শিক্ষিকা মেয়েরা

নিজের সবটুকু উজাড় করে তিন মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করেছিলেন। তিন মেয়েকেই স্বাবলম্বী ও প্রতিষ্ঠিত করে গর্ববোধ করতেন বাবা। কিন্তু জীবন সায়াহ্নে এসে সেই বাবার কপালেই জুটল চরম নিঃসঙ্গতা ও অবহেলা। বৃদ্ধাশ্রমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। এমনকি মৃত্যুর পরেও বাবার মুখটি শেষবারের মতো দেখতে আসেননি কোনো মেয়ে। বদলে ভিডিও কলে দাহকার্য দেখে এবং অনলাইনে মাত্র ৫১০০ টাকা পাঠিয়ে শেষ দায়িত্বটুকু সারলেন তাঁরা। চরম অমানবিক এই ঘটনাটি সামনে এসেছে হরিয়ানার সোনিপত থেকে।
সফল ব্যবসায়ী থেকে বৃদ্ধাশ্রমের একাকী বাসিন্দা
আদতে মুম্বইয়ের বাসিন্দা শিবচরণ রামরত্ন গুপ্ত একসময় জামাকাপড়ের সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। তবে জীবনের শেষ পর্বে এসে গত দুই বছর ধরে হরিয়ানার সোনিপতের একটি বৃদ্ধাশ্রমে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতে শুরু করেন তিনি। কয়েক বছর আগে স্ত্রী মীনা দেবী মারা যান। এরপর থেকে পুরো একা হয়ে পড়েন শিবচরণবাবু।
দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার রাত ৩টে বেজে ৩০ মিনিটে বৃদ্ধাশ্রমেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের তরফে তাঁর তিন মেয়েকে মৃত্যুর খবর জানানো হলেও, তাঁদের কেউই সোনিপতে পৌঁছাননি।
[ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণী]
* নিহতের নাম: শিবচরণ রামরত্ন গুপ্ত।
* আসল বাসস্থান: মুম্বই (পরবর্তীতে সোনিপতের বৃদ্ধাশ্রম)।
* সন্তানদের বর্তমান অবস্থান: নেপাল (শিক্ষিকা), উত্তরপ্রদেশ ও মুম্বই।
* শেষকৃত্যের ধরন: ভিডিও কলের মাধ্যমে সম্পন্ন, স্থানীয় বাসিন্দা ও বৃদ্ধাশ্রম কর্মীদের দ্বারা দাহকার্য।
* আর্থিক সাহায্য: নেপালে কর্মরত মেয়ের পাঠানো ৫১০০ টাকা।
“আমাদের সময় নেই, স্নান-খাওয়া বাকি!”
বৃদ্ধাশ্রমের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর আনন্দ কুমার জানান, বেশ কিছুদিন ধরেই গুরুতর অসুস্থ ছিলেন শিবচরণবাবু। ২০ দিন আগেই তিন মেয়েকে বাবার আশঙ্কাজনক অবস্থার কথা জানিয়ে খবর পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু কেউ দেখা করতে আসেননি। মৃত্যুর পরও একই প্রতিক্রিয়া— তিন মেয়েই জানান, সোনিপত আসার মতো ‘সময় নেই’ তাঁদের কাছে।
অবশেষে ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে বাবার শেষকৃত্য পর্যবেক্ষণ করেন তিন বোন। নেপালে শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত এক মেয়ে অনলাইনে ৫১০০ টাকা পাঠান এবং কৃত্য সম্পন্ন করার অনুরোধ জানান। তবে শেষকৃত্য চলাকালীনই ভিডিও কলে এক মেয়ের প্রশ্ন ছিল— “আর কতক্ষণ চলবে? আমাদের স্নান-খাওয়া বাকি আছে।” এমনকি চিতাভস্ম গঙ্গা কিংবা পবিত্র জলে ভাসানোর সময়টুকুও মেয়েরা দিতে পারবেন না জানিয়ে কর্তৃপক্ষকেই সেই দায়িত্ব দিয়ে দেন।
শেষ বিদায়েও মহত্ত্বের স্বাক্ষর
জীবনের শেষ অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে মেয়েদের অমানবিকতার শিকার হলেও, মৃত্যুর পর নিজের মহত্ত্বের প্রমাণ রেখে গেছেন শিবচরণবাবু। বেঁচে থাকতেই অঙ্গদানের অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করে গিয়েছিলেন তিনি। সেই অনুযায়ী, মৃত্যুর পর বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সফলভাবে তাঁর চক্ষুদান সম্পন্ন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং বৃদ্ধাশ্রমের কর্মীরা মিলে সমস্ত ধর্মীয় নিয়ম মেনে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। যে মেয়েদের মানুষ করতে জীবনের সমস্ত সঞ্চয় উজাড় করে দিয়েছিলেন, সেই মেয়েরাই শেষযাত্রায় পাশে না থাকায় সোনিপত জুড়ে উঠেছে ধিক্কারের ঝড়।
এক নজরে সোনিপতের ঘটনাটি:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| মৃত ব্যক্তি | শিবচরণ রামরত্ন গুপ্ত |
| ঘটনাস্থল | সোনিপত, হরিয়ানা |
| সন্তানদের অবস্থান | নেপাল, উত্তরপ্রদেশ ও মুম্বই |
| শেষকৃত্য সম্পাদনকারী | বৃদ্ধাশ্রমের কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা |
| অনলাইন অনুদান | ৫১০০ টাকা |
পিতামাতাকে প্রতিষ্ঠিত করার পর সন্তানরা কীভাবে তাঁদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, সোনিপতের এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি সমাজব্যবস্থার সেই কদর্য রূপকে আরও একবার উন্মোচিত করল। তিন মেয়েকে শিক্ষিত করার অহংকার নিয়ে চলে যাওয়া বাবা শেষযাত্রাতেও পেলেন না পরিবারের কারোর সামান্য স্পর্শ।






