কমিক জগতের ‘অস্কার’ আইসনারের চূড়ান্ত পর্বে বনগাঁর চার্বাক! আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাড়া ফেলল ‘লুবলুর পৃথিবী’

সুকুমার রায় থেকে শুরু করে নারায়ণ দেবনাথ কিংবা ময়ূখ চৌধুরী— চিত্রকাহিনি বা কমিকসের জগতে বাঙালির অবদান কোনো কাল্পনিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে নেই। অনুবাদের মাধ্যমে টিনটিন, অ্যাসটেরিক্স, ফ্যান্টম বা স্যান্ডম্যান পড়ার অভ্যাস থাকলেও বড়দের একটা বড় অংশের মধ্যে কমিকস নিয়ে সামান্য ‘নাক সিঁটকানি’ ভাব সবসময়ই স্পষ্ট। তবে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিলেন বনগাঁর তরুণ শিল্পী চার্বাক দীপ্ত। তাঁর সৃষ্ট কমিক বই ‘লুবলুর পৃথিবী’ এবার জায়গা করে নিল বিশ্ব কমিকস শিল্পের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ ‘উইল আইসনার অ্যাওয়ার্ডস’-এ।
কমিক জগতের ‘অস্কার’ মঞ্চে ভারতীয় বাঙালির সাফল্য
চিত্রকাহিনি বা কমিকস দুনিয়ায় উইল আইসনার অ্যাওয়ার্ডকে ধরা হয় বিশ্ব চলচ্চিত্রে ‘অস্কার’-এর সমতুল্য। সেই ঐতিহাসিক আইসনার অ্যাওয়ার্ডসের ডিজিটাল কমিক বিভাগে সেরা পাঁচের তালিকায় শর্টলিস্টেড হয়েছে বনগাঁর ছেলে চার্বাক দীপ্তর ‘লুবলুর পৃথিবী’। চূড়ান্ত জয়ী না হলেও এটিই প্রথম কোনো চিত্র কাহিনি যা ভারত তথা সমস্ত দক্ষিণ এশিয়া থেকে বিশ্বমঞ্চের এই উচ্চতায় পৌঁছাল। এর পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ‘হার্ভে অ্যাওয়ার্ড’-এর ডিজিটাল বুক অফ দ্য ইয়ার ক্যাটাগরিতেও স্থান পেয়েছে বইটি।
[চার্বাক দীপ্ত ও লুবলুর পৃথিবীর অনন্য রেকর্ডসমূহ]
* স্রষ্টা ও পটভূমি: চার্বাক দীপ্ত (বনগাঁর সন্তান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের প্রাক্তন ছাত্র)।
* আন্তর্জাতিক অর্জন: উইল আইসনার কমিকস অ্যাওয়ার্ডস (শীর্ষ ৫) ও হার্ভে অ্যাওয়ার্ডসে মনোনয়ন।
* বিশ্বজনীন রেকর্ড: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে প্রথম মন মনোনীত চিত্র কাহিনি।
* প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান: শান্তনু ঘোষ পরিচালিত 'বুক ফার্ম' (Book Farm)।
দর্শনের ভিত ও ‘লুবলুর পৃথিবী’র জন্মকথা
অনেক প্রকাশকের দোরগোড়ায় ঘুরেও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর চার্বাকের কাজের পাণ্ডুলিপি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রকাশনা সংস্থা ‘বুক ফার্ম’-এর কর্ণধার শান্তনু ঘোষ। বাজারচলতি থ্রিলার বা অ্যাডভেঞ্চারের বাইরে দাঁড়িয়ে গভীর এক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন চার্বাক।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করা চার্বাকের বাবার প্রিয় বিষয় ছিল দর্শন। সেই জায়গা থেকেই ‘দৃশ্যমান জগতের অস্তিত্ব অনুসন্ধান’— এই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই জন্ম নেয় ‘লুবলু’ চরিত্রটির মনোজগৎ। শান্তনু ঘোষ জানান, টিনটিনের চেয়েও প্রিমিয়াম কোয়ালিটি ধরে রাখতে তারা ১৩০ জিএসএমের জায়গায় ১৫০ জিএসএম কাগজ এবং ২৫০ জিএসএমের বদলে ৩৫০ জিএসএম বোর্ডের কভার ব্যবহার করে এটি প্রকাশ করেন।
গ্রাফিক উপন্যাসের নতুন দিগন্ত
কমিকসে কেবল গল্পই নয়, বরং রঙের ব্যবহার এবং গভীর চিন্তাভাবনা যে বিশ্বমানের হতে পারে, ‘লুবলুর পৃথিবী’ তা প্রমাণ করেছে। সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’ ও জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’-কে কেন্দ্র করে প্রকাশিত গ্রাফিক সিরিজ যেমন সমাদৃত হয়েছে, তেমনই লুবলুর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলা সাহিত্যের গ্রাফিক দুনিয়াকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিল। আপাতত চার্বাক দীপ্ত ও তাঁর উদাসীন চরিত্র লুবলু এবং বান্ধবি কিমের পরবর্তী ভ্রমণের (লুবলুর পৃথিবী ২) অপেক্ষায় দিন গুনছেন বাঙালি পাঠকেরা।
এক নজরে ‘লুবলুর পৃথিবী’ ও চার্বাক দীপ্তর সাফল্য:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| লেখক ও চিত্রশিল্পী | চার্বাক দীপ্ত (Charbak Dipto) |
| বইয়ের নাম | লুবলুর পৃথিবী (Lublur Prithibi) |
| আন্তর্জাতিক পুরস্কার মনোনয়ন | উইল আইসনার অ্যাওয়ার্ডস ও হার্ভে অ্যাওয়ার্ডস |
| দক্ষিণ এশীয় রেকর্ড | প্রথম দক্ষিণ এশীয় গ্রাফিক নোবেল হিসেবে আন্তর্জাতিক আইসনার তালিকায় স্থান |
| প্রকাশনা সংস্থা | বুক ফার্ম (Book Farm – শান্তনু ঘোষ) |
বাঙালির মননশীলতা এবং চিত্রকলা যে বিশ্বসেরাদের সাথে টেক্কা দিতে সক্ষম, তা আরও একবার প্রমাণ করলেন চার্বাক দীপ্ত। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে এই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে আগামী দিনের তরুণ চিত্রশিল্পী ও কমিকস লেখকদের এক নতুন অনুপ্রেরণা যোগাবে।






