ভগ্নিপতি গ্রেপ্তারের পর অন্তরালে থেকেই রক্ষাকবচের আবেদন! কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ বীরভূমের ‘পাথর সম্রাট’ টুলু মণ্ডল

বীরভূমের মহম্মদবাজার ও সিউড়ির পাথর ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক ও অনুব্রত মণ্ডল ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতি ও আইনি আঙিনায় নাটকীয়তা তুঙ্গে। তাঁর আত্মীয় তথা ভগ্নিপতি মিনার মণ্ডল বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও সোনা সহ ধরা পড়ার পর থেকেই নিখোঁজ টুলু। গুঞ্জন রয়েছে, পুলিশের নজর এড়াতে তিনি ইতোমধ্যে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। তবে গা-ঢাকা দিয়ে থাকলেও আইনি পথ খোলা রাখতে অন্তরাল থেকেই কলকাতা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছেন ‘পাথর সম্রাট’ টুলু মণ্ডল।
দিনমজুর থেকে অঢেল সাম্রাজ্য: টুলুর রূপকথার মতো উত্থান
বীরভূমের রাজনীতি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে টুলু মণ্ডলের উত্থান বেশ চর্চিত বিষয়। একসময় দিনে দিনমজুরি এবং সন্ধ্যায় টিউশনি করে পেট চালাতেন তিনি। এরপর লরিতে পাথর চাপানোর ইজারা নেওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যবসা শুরু। সেখান থেকে ধীরে ধীরে নিজের বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা কাজে লাগিয়ে লরি কিনে পরিবহন ব্যবসায় হাত পাকান।
পরবর্তীতে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বীরভূমের রাজনীতিতে তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার পরেই কপাল খুলে যায় টুলুর। মহম্মদবাজারের পাথর খাদান ও ডিসিআর (DCR) টোল গেট পরিচালনার একচ্ছত্র দায়িত্ব পাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে পাহাড়প্রমাণ ধনসম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন তিনি।
[টুলু মণ্ডলের মোট বাজেয়াপ্ত ও চিহ্নিত সম্পত্তি (নথিবদ্ধ তথ্য অনুযায়ী)]
* ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জমানো: প্রায় ৯৩ কোটি টাকা (ফ্রিজ করা)।
* নগদ টাকা ও অলঙ্কার: ৫৩ লক্ষ টাকা নগদ, ২৬৮ গ্রাম সোনা, ৪০০ গ্রাম রুপো, ৬৩ গ্রাম প্ল্যাটিনাম।
* বিলাসবহুল যানবহন: ৮৩টি ট্রাক/ডাম্পার, বিএমডব্লিউ, অডি সহ মোট ২৪২টি গাড়ি।
* স্থাবর সম্পত্তি: ৭টি বাড়ি, ১টি ফার্মহাউস, ২টি পেট্রোল পাম্প, ২টি ক্রাশার ও ৩০০ বিঘা জমি।
মিনার মণ্ডলের গ্রেপ্তার ও বিশাল নগদ উদ্ধার
সম্প্রতি মহম্মদবাজার থানায় টুলু মণ্ডলের ভগ্নিপতি মিনার মণ্ডলের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ট্রাঙ্কভর্তি প্রায় সাড়ে ২৮ কোটি টাকা নগদ এবং ১৫ কেজি সোনা বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ। জেরায় ধৃত মিনার স্বীকার করেন যে, পাথর সিন্ডিকেটের অবৈধ এই বিপুল অর্থ ও সম্পত্তি মূলত টুলু মণ্ডলেরই রাখা গচ্ছিত ধন।
এর পরপরই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক সাংবাদিক সম্মেলনে টুলু মণ্ডলের পাহাড়প্রমাণ বেনামী সাম্রাজ্যের খতিয়ান প্রকাশ্যে আনেন এবং এর পেছনে শীর্ষ রাজনৈতিক মদতের অভিযোগ তুলে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেন।
হাইকোর্টে রক্ষাকবচের আর্জি ও আইনি লড়াই
টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানা ও প্রশাসনের তরফে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। পুলিশ তাঁকে ধরতে রাজ্য ও রাজ্যবাইড চিরুনি তল্লাশি চালালেও এখনও অধরা তিনি। এই পরিস্থিতিতে হাইকোর্টে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ (Protective Order / Interim Protection) চেয়ে আবেদন জমা দিয়েছেন তাঁর আইনজীবীরা।
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চে মামলাটির আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং শুনানির ওপরই নির্ভর করবে টুলু মণ্ডল পুলিশি গ্রেপ্তারির হাত থেকে সাময়িক সুরক্ষা পাবেন নাকি তাঁকে আদালতের আত্মসমর্পণ করতে হবে।
এক নজরে টুলু মণ্ডল মামলা ও সম্পত্তি খতিয়ান:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| আবেদনকারী | টুলু মণ্ডল (বীরভূমের পাথর ব্যবসায়ী) |
| আদালত ও বেঞ্চ | কলকাতা হাইকোর্ট (বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য) |
| মামলার উদ্দেশ্য | পুলিশি তল্লাশি ও গ্রেপ্তারি থেকে অন্তর্বর্তী আইনি সুরক্ষার আর্জি |
| সূচনা ঘটনা | ভগ্নিপতি মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে সাড়ে ২৮ কোটি টাকা ও ১৫ কেজি সোনা উদ্ধার |
| মোট উদ্ধার ও স্থাবর সম্পত্তি | ৩০০ বিঘা জমি, ৯৩ কোটি ব্যাংকে, ২৪২টি যানবাহন |
বীরভূমের বালি ও পাথর সিন্ডিকেটের দুর্নীতি তদন্তে টুলু মণ্ডলের মামলাটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। গা-ঢাকা দেওয়া অবস্থায় হাইকোর্টের এই রক্ষাকবচের আর্জি বিচারপতি মঞ্জুর করেন নাকি আর্জি খারিজ করে পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন, সেদিকেই এখন নজর রাজ্য রাজনীতির।






