তামিলনাড়ুতে চাকরির ফাঁদ, সন্দেশখালির যুবতীকে বাংলাদেশে পাচার! ওপার বাংলা থেকে ফোন আসতেই তোলপাড়

দক্ষিণ ভারতে লোভনীয় চাকরির টোপ দিয়ে সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের মানব পাচারের আন্তর্জাতিক চক্রে ঠেলে দেওয়ার এক শিউরে ওঠার মতো ঘটনা সামনে এলো। উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালির এক গৃহবধূকে তামিলনাড়ুতে কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চোরাপথে বাংলাদেশে পাচার করে দিল এক দুষ্কৃতী দল। ওপার বাংলায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর সেখান থেকে কোনোরকমে পালিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের এক হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ওই যুবতী। এই ঘটনায় উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর থানায় সুনির্দিষ্ট অপহরণ ও পাচারের মামলা রুজু হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কাজের প্রলোভন ও উধাও হওয়া
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগকারী যুবকের মূল বাড়ি সন্দেশখালিতে হলেও তিনি বর্তমানে কলকাতার গালিফ স্ট্রিট এলাকায় বসবাস করেন। তাঁর বোন সন্দেশখালির শ্বশুরবাড়ি থেকে বের হয়ে ভাইয়ের কাছে গালিফ স্ট্রিটে এসে বেশ কিছু দিন ধরে কাজ খুঁজছিলেন।
সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয় তাঁর। ওই ব্যক্তি তাঁকে তামিলনাড়ুতে মোটা মাইনের কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। চাকরির আশায় গত ১ জুলাই বাড়ি থেকে বের হন ওই যুবতী। তারপর থেকে পরিবারের সাথে আর কোনো যোগাযোগ ছিল না তাঁর।
[ঘটনা সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণী]
* আক্রান্ত যুবতীর মূল বাসস্থান: সন্দেশখালি, উত্তর ২৪ পরগনা (বর্তমান ঠিকানা: গালিফ স্ট্রিট, কলকাতা)।
* ঘটনার সূত্রপাত: ১ জুলাই, ২০২৬ (সোশ্যাল মিডিয়ায় চাকরির মিথ্যা টোপ)।
* বর্তমান অবস্থান: গোপালগঞ্জ হাসপাতাল, বাংলাদেশ।
* অভিযোগকারী থানা: শ্যামপুকুর থানা, কলকাতা।
* যোগাযোগের মাধ্যম: বাংলাদেশে 'লামিয়া আখতার' নাম্নী এক মহিলার মোবাইল নম্বর থেকে পাওয়া ফোন।
“আমাকে অপহরণ করা হয়েছে!” — বাংলাদেশ থেকে এল ফোন
দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর গত ১৮ জুলাই দুপুরে অভিযোগকারী যুবকের মোবাইলে বাংলাদেশের একটি অজানা নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনটি করেন ‘লামিয়া আখতার’ নাম্নী এক স্থানীয় মহিলা। ফোন রিসিভ করতেই ওপার থেকে বোনের গলা শুনতে পান ওই যুবক।
টানা ৩ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডের কথোপকথনে জখম যুবতী জানান, তাঁকে তামিলনাড়ু নিয়ে যাওয়ার নাম করে আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র জোর করে সীমান্ত পার করিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। কোনোক্রমে পাচারকারীদের হাত থেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে তিনি গোপালগঞ্জের এক সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে ওই ফোনকলের পর পরিবারের তরফে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আর সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক স্তরে পুলিশি তদন্ত ও বিদেশমন্ত্রকের হস্তক্ষেপ
প্রথমে সন্দেশখালি থানায় মিসিং ডায়েরি করা হলেও পরবর্তী সময়ে ঘটনার মারাত্মক মোড় দেখে কলকাতার শ্যামপুকুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে পরিবার। পুলিশ জালিয়াতি, অপহরণ এবং নারী পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা রুজু করেছে।
কলকাতা পুলিশ ইতিমধ্যেই বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও বিদেশমন্ত্রকের নজরে এনে বাংলাদেশ পুলিশের সাথে কূটনৈতিক মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিল, সেই ‘লামিয়া আখতার’-এর টাওয়ার লোকেশন ট্রেস করার অনুরোধ জানানো হয়েছে বাংলাদেশ প্রশাসনকে। একইসাথে হাসপাতালে যুবতীর নাম ও ছবি পাঠিয়ে তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে ভারতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এক নজরে পাচার কাণ্ডের বিবরণী:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| ঘটনাস্থল ও এলাকা | গালিফ স্ট্রিট (কলকাতা) থেকে বাংলাদেশ |
| মূল অভিযোগ | চাকরি দেওয়ার নামে আন্তর্জাতিক নারী পাচার |
| ভুক্তভোগী | সন্দেশখালির বিবাহিত যুবতী |
| আইনি পদক্ষেপ | শ্যামপুকুর থানায় মামলা রুজু ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ |
সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র কীভাবে সাধারণ মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিচ্ছে, এই ঘটনা তা আরও একবার স্পষ্ট করে দিল। কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রক ও বাংলাদেশ পুলিশের যৌথ পদক্ষেপে ওই যুবতী কত দ্রুত স্বদেশে ফিরে আসতে পারেন, সেদিকেই নজর রাখছে পরিবার।






