নায়ক হওয়ার স্বপ্নে বাড়ি ছাড়া! ৩৫ বছর পর ‘মৃত’ ভেবে নেওয়া ছেলে সশরীরে ফিরল নদীয়ার পিপুলখোলায়

রূপালী পর্দার নায়ক হওয়ার অদম্য নেশা তাড়া করে বেরিয়েছিল ১৬ বছরের এক গ্রাম্য কিশোরকে। সিনেমা জগতে অভিনয় করার স্বপ্ন নিয়ে প্রায় ৩৫ বছর আগে হঠাৎ একদিন না জানিয়েই বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যান তিনি। বহু খোঁজাখুঁজির পরও কোনো খোঁজ না মেলায় ধরে নেওয়া হয়েছিল ছেলে হয়তো আর বেঁচে নেই। অবশেষে সমস্ত সিনেমাটিক গল্পকেও হার মানিয়ে সাড়ে তিন দশক পর ‘মৃত’ ভেবে নেওয়া সেই ছেলে জীবিত অবস্থায় ফিরে এলেন নদীয়ার নিজের ভিটেয়। নদীয়া জেলার থানারপাড়া থানার পিপুলখোলা গ্রামের এই ঘটনায় ছড়িয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আনন্দ।
স্বপ্নের টানে মুম্বইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা ও অসমবাস
নদীয়ার পিপুলখোলা গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধ উহাব শেখের ছেলে রেন্টু শেখ। প্রায় ৩৫ বছর আগে বড় পর্দার হিরো হওয়ার নেশায় কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি ছাড়েন ১৬ বছরের রেন্টু। লক্ষ্য ছিল মায়ানগরী মুম্বই।
তবে ভাগ্য সহায় হয়নি। অভিনয় জগত পর্যন্ত পৌঁছাতে না পেরে উপার্জনের তাগিদে তিনি শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছান অসমের গুয়াহাটিতে। সেখানেই কাজ শুরু করেন এবং দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায়। পর্যাপ্ত যোগাযোগের সুযোগ ও মাধ্যম না থাকায় এতদিন আর পরিবারের সাথে যোগাযোগ বা বাড়ি ফেরা হয়ে ওঠেনি তাঁর।
[ঘটনা সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণী]
* হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তি: রেন্টু শেখ (বর্তমান বয়স ৫১ বছর)।
* স্থান: পিপুলখোলা গ্রাম, থানারপাড়া থানা, নদীয়া জেলা।
* বাড়ি ছাড়ার বয়স ও কারণ: ১৬ বছর বয়সে (সিনেমা অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নে)।
* নিখোঁজ থাকার মেয়াদ: দীর্ঘ ৩৫ বছর (১৯৯১-২০২৬)।
* এতদিন কোথায় ছিলেন: গুয়াহাটি, অসম (কাজের সূত্রে)।
ছবি ছাড়াই এফআইআর ও বাংলাদেশজুড়ে সন্ধান
রেন্টু নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় ডায়েরি করেছিলেন স্বজনেরা। কিন্তু সেই সময় রেন্টুর কোনো ছবি না থাকায় আইনি পদক্ষেপে বাধা তৈরি হয়। তবুও হাল ছাড়েনি পরিবার।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা অসম নয়, সীমান্ত পার করে বাংলাদেশের বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়েছিল। বছরের পর বছর কোনো হদিশ না মেলায় শেষমেশ আশা ছেড়ে দিয়ে ছেলেকে ‘মৃত’ বলেই মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন বৃদ্ধ বাবা উহাব শেখ।
কানের গঠন ও শৈশবের বন্ধুই হয়ে উঠল চেনার চাবিকাঠি
৩৫ বছর পর অচেনা এক মাঝবয়সী ব্যক্তি গ্রামে ঢুকলে চিনতে কিছুটা সময় লাগে গ্রামবাসীর। পরিবর্তন এসেছে গ্রামের পরিকাঠামোতেও। তবে নিজের রক্তের সন্তানকে চিনতে ভুল হয়নি বাবা উহাব শেখের। কানের একটি বিশেষ ভাঁজ এবং ছোটবেলার কিছু বিশেষ পারিবারিক স্মৃতির কথা বলতেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন বাবা।
অন্যদিকে রেন্টুর শৈশবের বন্ধু জুবায়ের আহমেদ প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলেন তাঁকে। জুবায়ের জানান, “ছোটবেলা থেকে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত আমরা একসাথে খেলেছি, বড় হয়েছি। গ্রামের ছবি বদলে যাওয়ায় ও বাড়ি চিনতে পারছিল না, কিন্তু আমি বন্ধুকে প্রথম সাক্ষাতেই চিনে নিয়েছি।”
এক নজরে রেন্টু শেখের প্রত্যাবর্তনের কাহিনী:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| ব্যক্তিত্ব | রেন্টু শেখ |
| গ্রাম ও জেলা | পিপুলখোলা, থানারপাড়া, নদীয়া |
| নিখোঁজের সময়কাল | দীর্ঘ ৩৫ বছর |
| বর্তমান পরিকল্পনা | পরিবার ও বন্ধুদের সাথে কিছুদিন কাটিয়ে ফের গুয়াহাটিতে কাজে যোগ দেওয়া |
বাস্তব যে কখনো কখনো রূপালী পর্দার চিত্রনাট্যকেও ছাপিয়ে যেতে পারে, নদীয়ার রেন্টু শেখের এই অলৌকিক প্রত্যাবর্তন তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ। পরিবারের সাথে কয়েকমাস কাটিয়ে তিনি ফের কাজে ফিরবেন জানালেও, এই মুহূর্তের উৎসবের আমেজ গোটা পিপুলখোলা গ্রামজুড়ে।






