লাইমলাইটের বাইরে থেকে শিক্ষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আসল লড়াই! ঝাড়খণ্ডে অনশনে রাঁচির ছাত্রনেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো, বাড়ালেন লড়াইয়ের জোর

দিল্লিতে নিট (NEET) কেলেঙ্কারির তীব্র প্রতিবাদ এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনের জোড়া ধাক্কায় শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে হয়েছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রককে। কিন্তু সেই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও স্বচ্ছতার আন্দোলন আজ আর শুধু দিল্লির যন্তর মন্তরে সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে ঝাড়খণ্ডে। তবে এই আন্দোলনের মূল কাণ্ডারী কোনো নামিদামি মিডিয়া সেলিব্রিটি নন; বরং প্রচারের আলো থেকে বহুদূরে থেকে নীরব সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন রাঁচির তরুণ ছাত্রনেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো।
কে এই দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো?
৩৫ বছর বয়সী দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো রাঁচির ঐতিহ্যবাহী ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২০ সালে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করেন। শুধুমাত্র একটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর নয়, সংস্কৃত ও কুড়মালি ভাষাসহ একাধিক বিষয়ে তিনি উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া হাজারিবাগ থেকে সম্পূর্ণ করেছেন বি.এড পাঠ্যক্রম।
বিপুল শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোনো কর্পোরেট চাকরি বা প্রতিষ্ঠানে যোগ না দিয়ে দেবেন্দ্রনাথ বেছে নেন সমাজ সংস্কার ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার পথ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চা (JKLM)-র হয়ে সিল্লি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। নির্বাচনে জয় না পেলেও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার থেকে বিন্দুমাত্র পিছপা হননি তিনি।
[দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোর আন্দোলনের রূপরেখা]
* আন্দোলনের স্থান: স্টেডিয়াম চত্বর, রাঁচি (ঝাড়খণ্ড)।
* অভিযোগের মূল ক্ষেত্র: JPSC এবং JSSC (CGL) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও কারচুপি।
* অনশনের রূপ: টানা ৭ দিন ধরে খাদ্য গ্রহণ বন্ধ রেখে অনশন।
* প্রধান দাবি: বিতর্কিত সব পরীক্ষা বাতিল করে নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত।
ঝাড়খণ্ডের অনশন ও শিক্ষার্থীদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ
সম্প্রতি কেন্দ্র সরকারের নিট কেলেঙ্কারির মতো ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পাবলিক সার্ভিস কমিশন (JPSC) এবং স্টাফ সিলেকশন কমিশনের কম্বাইনড গ্র্যাজুয়েট লেভেল (JSSC CGL) পরীক্ষায় বিপুল অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে। বহু যোগ্য ও বঞ্চিত পরীক্ষার্থী রাঁচির স্টেডিয়াম চত্বরে প্রতিবাদ শুরু করলে তাঁদের আন্দোলনের মূল মুখ হিসেবে নিজেকে সঁপে দেন দেবেন্দ্রনাথ।
অনশনমঞ্চ থেকে স্পষ্ট ভাষায় দেবেন্দ্রনাথ জানান, “রাজ্য সরকার ও কমিশন— দুটির হাবভাবের ওপরই ঝাড়খণ্ডের ছাত্রসমাজ ভীষণ ক্ষুব্ধ। পরীক্ষার্থীদের এই ন্যায়ের লড়াইয়ে শক্তি জোগাতেই আমি খাবার খাওয়া ছেড়েছি। আমাদের স্পষ্ট লক্ষ্য, অসচ্ছতায় ভরা সমস্ত পরীক্ষা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং সমগ্র পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।”

দুই প্রান্তের দুই ‘ওয়াংচুক’-এর ঐতিহাসিক যোগাযোগ
শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে লড়াই চালিয়ে যাওয়া এই দুই লড়াকু ব্যক্তিত্বকে এক সুতোয় গেঁথে দিল তাঁদের একই আদর্শ। লাদাখ থেকে ভিডিও কল করে দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোর সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলেন ‘ককরোচ’ আন্দোলনের অগ্রদূত সোনম ওয়াংচুক।
দেবেন্দ্রনাথের এই অদম্য জেদকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লাদাখ-ম্যান পরামর্শ দেন, অনশন চলাকালীন সম্পূর্ণ না খেয়ে না থেকে অন্তত সামান্য জল বা অন্যান্য তরল যেন তিনি গ্রহণ করেন, যাতে শরীর সচল থাকে। দেশের দুই প্রান্তের দুই মানুষের এই যোগাযোগ যেন বার্তা দিয়ে গেল— নাম বা ঠিকানায় ফারাক থাকলেও, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের লড়াই আসলে একই সুতোয় বাঁধা।
এক নজরে দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো ও ঝাড়খণ্ডের আন্দোলন:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| আন্দোলনকারী | দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো (ছাত্রনেতা ও সমাজসেবী) |
| শিক্ষাগত যোগ্যতা | সংস্কৃত, কুড়মালি ভাষায় স্নাতকোত্তর ও বি.এড |
| রাজনৈতিক পরিচিতি | প্রাক্তন JKLM প্রার্থী (সিল্লি আসন, ২০২৪) |
| অনশনের কারণ | JPSC ও JSSC CGL পরীক্ষায় দুর্নীতির প্রতিবাদ |
| বিশেষ প্রাপ্তি | সোনম ওয়াংচুকের সরাসরি ভিডিও কল ও সমর্থন |
প্রচার ও খ্যাতির আলো থেকে দূরে থাকলেও দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোর অনশন আন্দোলন আজ ঝাড়খণ্ডের হাজার হাজার বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। সরকারি পরীক্ষায় স্বচ্ছতা না আসা পর্যন্ত এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন ছাত্রনেতা।






