এবার ইডির রাডারে বীরভূমের বালি-পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল! ২২০ কোটির সাম্রাজ্য, হাওয়ালা ও দুবাই-সুইজারল্যান্ড যোগ খতিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় সংস্থা

দিনমজুর থেকে কয়েক বছরের ব্যবধানে কয়েকশো কোটি টাকার মালিক! বীরভূমের মহম্মদবাজার ও সিউড়ি এলাকার বালি-পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের এমন উল্কার গতিতে সম্পত্তি বৃদ্ধি দেখে তাজ্জব সাধারণ মানুষ থেকে তদন্তকারী আধিকারিকরাও। এসটিএফ (STF) ও জেলা পুলিশের জোরদার অভিযানের পর এবার প্রসাধন বা আড়ালের পেছনে থাকা বিপুল কালো টাকার উৎস সন্ধান করতে আসরে নামছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি (ED)।
জেলা পুলিশের যৌথ অভিযান ও ২২০ কোটির বিশাল বাজেয়াপ্তি
বীরভূমের পুলিশ সুপার বিদিত রাজ ভুন্দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, টুলু মণ্ডল এবং তাঁর আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বিভিন্ন আস্তানা থেকে এ যাবত প্রায় ২২০ কোটি টাকার সম্পত্তি আদালতের নির্দেশে বাজেয়াপ্ত ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা কোটি কোটি ফিক্সড ডিপোজিট ও নগদ অর্থ তো রয়েছেই, এর পাশাপাশি প্রায় ৪০০ বিঘা জমি, একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি, পেট্রোল পাম্প ও রিসর্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে এও খবর যে, টুলুর স্ত্রী ও মেয়ের নামেও বিপুল পরিমাণ বেনামী সম্পত্তি ও একাধিক কাগুজে সংস্থার (Shell Companies) হদিশ মিলছে।
[টুলু মণ্ডলের বাজেয়াপ্ত ও চিহ্নিত সম্পদের সামারি]
* আনুমানিক মোট আর্থিক মূল্য: প্রায় ২২০ কোটি টাকা।
* স্থানীয় জমি-বাড়ি: বীরভূম ও আশেপাশের জেলায় প্রায় ৪০০ বিঘা জমি ও একাধিক নির্মাণ।
* আন্তর্জাতিক বিনোদন সম্পদ: দুবাই ও বিদেশে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও রিসর্ট বিনিয়োগ।
* আন্তর্জাতিক গোল্ড রুট: মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল সোনা (দুবাই ও সুইজারল্যান্ড যোগ)।
* কর জমা বিবরণী: গত অর্থবর্ষে ৪৫ কোটি টাকা আয়কর জমা।
ইডির আতশকাচে আন্তর্জাতিক সোনা পাচার ও হাওয়ালা কারবার
জেলা পুলিশের কাছ থেকে ইতোমধ্যে একাধিক প্রাথমিক নথি ও এফআইআরের (FIR) কপি হাতে পেয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি। ইডি আধিকারিকদের নজর মূলত তিনটি মূল বিষয়ের ওপর—
১. উদ্ধার হওয়া কেজি কেজি সোনার বার কীভাবে ভারতে আনা হয়েছিল এবং সেগুলি বৈধ আমদানিকৃত কিনা?
২. দুবাই, সুইজারল্যান্ড বা অন্যান্য দেশে টুলুর ফ্ল্যাট ও রিসর্ট কেনার টাকা হাওয়ালার (Hawala) মাধ্যমে বাইরে পাঠানো হয়েছিল কিনা?
৩. বালি ও পাথর খাদানের অবৈধ লেনদেনের কোটি কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে কার হাতে পৌছেছিল?
গৃহশিক্ষক থেকে পাথর সাম্রাজ্যের অধিপতি
টুলু মণ্ডলের এই অলৌকিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম নয়। জীবনের শুরুতে দিনমজুরি এবং সন্ধ্যায় প্রাইভেট টিউশনি করে দিন গুজরান করা টুলু ধীরে ধীরে লরিতে পাথর পরিবহনের ব্যবসা ধরেন।
পরবর্তীতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে বীরভূমের খনি অঞ্চল ও টোল গেটের সম্পূর্ণ একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন তিনি। গত অর্থবছরে খাতা-কলমে ৪৫ কোটি টাকা আয়কর জমা দিলেও তাঁর আসল সম্পদের পরিমাণ কত, তা ইডির তল্লাশিতেই স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এক নজরে টুলু মণ্ডল ও ইডি তদন্তের তথ্য তালিকা:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| মূল অভিযুক্ত | টুলু মণ্ডল (বীরভূমের বালি-পাথর ব্যবসায়ী) |
| তদন্তকারী সংস্থা | বীরভূম জেলা পুলিশ, এসটিএফ (STF) এবং ইডি (ED) |
| মোট বাজেয়াপ্ত মূল্য | প্রায় ২২০ কোটি টাকা |
| প্রধান সন্দেহ | মানি লন্ডারিং, আন্তর্জাতিক সোনা পাচার ও বেআইনি হাওয়ালা |
| আন্তর্জাতিক রুট | দুবাই, সুইজারল্যান্ড এবং ওভারসিজ বিনিয়োগ |
বীরভূমের বালি ও পাথর খাদানের অন্ধকার জগতের দুর্নীতি কেবল রাজ্য সীমানায় আটকে নেই, তা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। ইডি আনুষ্ঠানিকভাবে পিএমএলএ (PMLA) আইনে মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করলে টুলু মণ্ডলের পাশাপাশি রাজ্য রাজনীতির একাধিক রাঘববোয়ালদের অস্বস্তি বহুগুণ বাড়তে চলেছে।





