চিনের তিব্বত থেকে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ৩,৫০০ কিমি দীর্ঘ মেঘমালা! উপগ্রহ চিত্রে সক্রিয় বর্ষার অভূতপূর্ব রূপ দেখে তাক লাগল বিজ্ঞানীদের

আকাশের বুকে যেন বিছানো রয়েছে উজ্জ্বল সাদা রিবনের মতো অবিরত এক দীর্ঘ চাদর! ভারতের অত্যাধুনিক আবহাওয়া উপগ্রহ ‘ইনস্যাট-৩ডিএস’ (INSAT-3DS)-এর থার্মাল ইনফ্রারেড চ্যানেলে তোলা একটি নতুন স্যাটেলাইট চিত্র দেখে চমকে গিয়েছেন আবহাওয়াবিজ্ঞানী ও গবেষকরা। পশ্চিম চিন ও তিব্বত মালভূমি থেকে শুরু করে হিমালয় পর্বতমালা টপকে উত্তর ও মধ্য ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক অভূতপূর্ব মেঘের ব্যান্ড বা মেঘমালা ধরা পড়েছে সেই চিত্রে।
থার্মাল ইনফ্রারেড’ ইমেজিং প্রযুক্তিতে ধরা পড়া শীতলতম মেঘ
উপগ্রহটিতে থাকা ইনফ্রারেড প্রযুক্তির সাহায্যে মেঘের শীর্ষভাগের তাপমাত্রা পরিমাপ করা হয়। ইনস্যাট-৩ডিএস-এর পাঠানো ছবিতে যে জ্বলজ্বলে সাদা অংশগুলি দেখা যাচ্ছে, সেগুলি বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে ঠান্ডা এবং সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত মেঘকে নির্দেশ করে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই মেঘগুলির শীর্ষভাগ ট্রপোপজ (Tropopause)-এর কাছাকাছি অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৬ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছে। প্রথম দর্শনে এটি কোনো প্রকাণ্ড সুপার সাইক্লোন মনে হলেও, বাস্তবে এটি বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগের অত্যন্ত শীতল বরফ-মেঘের (High-altitude Ice Clouds) এক বিশালাকার প্রাকৃতিক রূপ।

[ইনস্যাট-৩ডিএস চিত্রে ধরা পড়া মেঘমালার মূল বিবরণ]
* পরিমাপ ও দৈর্ঘ্য: প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অবিচ্ছিন্ন ব্যান্ড।
* বিস্তৃত অঞ্চল: পশ্চিম চিন, তিব্বত মালভূমি, হিমালয় পর্বতমালা, উত্তর ও মধ্য ভারত।
* মেঘের ধরন: বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরের বরফ-মেঘ (Cirrus Clouds / Ice Clouds)।
* সর্বোচ্চ উচ্চতা: ট্রপোপজের কাছাকাছি (১০ থেকে ১৬ কিলোমিটার)।
* প্রযুক্তির নাম: থার্মাল ইনফ্রারেড সেন্সরিং (INSAT-3DS)।
কীভাবে তৈরি হলো ৩,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেঘের চাদর?
বর্ষাকালে উত্তর ও মধ্য ভারতের ওপর তৈরি হওয়া শক্তিশালী ও আর্দ্র বজ্রমেঘ (Thunderstorms) থেকে উষ্ণ বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প দ্রুত উঁচুতে উঠতে থাকে।
ঝড় যখন তাদের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছায়, তখন মেঘের শীর্ষভাগ কামারশালার নেহাই বা ‘অ্যানভিল’-এর (Anvil) মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে গঠন করে অতি সূক্ষ্ম বরফের স্ফটিক দিয়ে তৈরি ‘সিরাস কোন’ (Cirrus Clouds)। বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগের তীব্র বাতাস একাধিক ঝড়ের চূড়া থেকে নির্গত এই বরফ-মেঘগুলিকে শত শত কিলোমিটার দূরে ঠেলে নিয়ে গিয়ে একত্রে জুড়ে দেয়। ফলে তৈরি হয় এই ৩,৫০০ কিমি জোড়া সুবিশাল অবিরত মেঘের ব্যান্ড।
সাইক্লোন নয়, এটি সক্রিয় তীব্র বর্ষার বড় সংকেত
আবহাওয়াবিদরা স্পষ্ট করেছেন যে, স্যাটেলাইট চিত্রে দৃশ্যমান এই মেঘমালা কোনো সাইক্লোন বা নিম্নচাপের সৃষ্টি নয়। বরং এটি পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে একসাথে ঘটে চলা অসংখ্য তীব্র বর্ষার ঝড়ের এক সম্মিলিত বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিফলন।
দক্ষিণ ভারতের ‘ট্রপিক্যাল ইস্টার্লি জেট’ (Tropical Easterly Jet) এবং আরও উত্তরে থাকা ‘ওয়েস্টার্লি’ (Westerlies) বায়ুর সম্মিলিত টানে মেঘমালাটি এই দীর্ঘ আকৃতি ধারণ করেছে। এর অর্থ— মেঘের এই চাদরের নিচে বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ-সহ সক্রিয় বর্ষার বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।
এক নজরে ইনস্যাট-৩ডিএস স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ:
| বিষয় | বিবরণ / তথ্য |
| উপগ্রহের নাম | ইনস্যাট-৩ডিএস (INSAT-3DS) |
| মেঘমালার দৈর্ঘ্য | ৩,৫০০ কিলোমিটার |
| মেঘের উচ্চতা | ট্রপোপজ সংলগ্ন (১০-১৬ কিমি) |
| আবহাওয়াগত অর্থ | ভারতজুড়ে অতি-সক্রিয় বর্ষা ও ভারী বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সংকেত |
আগামী দিনগুলিতেও দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকায় মহাকাশ থেকে বায়ুমণ্ডলের এমন বিস্ময়কর ও অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক রূপ আরও দৃশ্যমান থাকবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ইসরোর এই অত্যাধুনিক উপগ্রহের ডেটা আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও নিখুঁত করতে সাহায্য করবে।






