West Bengal UCC Committee Formed: বাংলায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করতে বড় পদক্ষেপ! বিচারপতি রঞ্জনা দেশাইয়ের নেতৃত্বে কমিটি গড়লেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, বাদ আদিবাসীরা

source :আনন্দবাজার
পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (Uniform Civil Code – UCC) বলবৎ করার প্রক্রিয়াকে এক ধাক্কায় অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গেল নবগঠিত বিজেপি সরকার। সোমবার বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের প্রথম পর্বের শেষ দিনে এক ঐতিহাসিক ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যে ইউসিসি বিলের রূপরেখা স্পষ্ট করেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকার যে অনড়, তা মনে করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী একটি উচ্চপর্যায়ের খসড়া কমিটি গঠনের কথা জানান, যার রিপোর্ট পাওয়ার পর আগামী অগস্ট মাসেই বিধানসভায় বিলটি পাস করানো হবে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, রাজ্য সরকারের ঘোষিত এই কমিটির চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব সামলাবেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা দেশাই। উল্লেখ্য, এর আগে উত্তরাখণ্ড ও গুজরাতের ইউসিসি কমিটির নেতৃত্বও দিয়েছিলেন তিনি। রঞ্জনা দেশাই ছাড়াও এই হাই-প্রোফাইল কমিটিতে থাকছেন:
- একজন অবসরপ্রাপ্ত আইএএস (IAS) আধিকারিক।
- একজন আইন বিশেষজ্ঞ।
- একজন শিক্ষাবিদ ও একজন সমাজকর্মী।
- রাজ্য সরকারের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব (যিনি কমিটির সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন)।
কমিটিকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে তাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ সমীক্ষা ও সুপারিশ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই কমিটি রাজ্যে বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন ধর্মের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনগুলির বিস্তারিত মূল্যায়ন করবে। মূলত বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ (Divorce), ভরণপোষণ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ এবং লিভ-ইন সম্পর্ক (Live-in Relationships)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির সামাজিক ও আইনি প্রভাব খতিয়ে দেখে একটি নিরপেক্ষ খসড়া তৈরি করাই এই কমিটির প্রধান কাজ।
পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি বহুত্ববাদী রাজ্যে ইউসিসি কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় চমক দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাজ্যের আদিবাসী, মূলবাসী, কুড়মি এবং অন্যান্য স্বীকৃত প্রাচীন জনজাতি সম্প্রদায়কে এই প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আওতার বাইরে রাখা হবে। উত্তরাখণ্ড, গুজরাত এবং অসমের ইউসিসি মডেল এবং সেখানকার উপজাতিদের দেওয়া রক্ষাকবচকে ভিত্তি করেই পশ্চিমবঙ্গে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
আগামী ২ জুলাই রাজ্য মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠক ডাকা হয়েছে, যেখানে এই বিলের প্রাথমিক খসড়াটি অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে। গুজরাতের ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিল-২০২৬, অসমের ইউসিসি এবং উত্তরাখণ্ডের ২০২৪ সালের আইনকে সামনে রেখেই বাংলার বিলটি তৈরি হচ্ছে।
সোমবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন:
“ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনী সংকল্পপত্রে ইউসিসি কার্যকরের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল। আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সংকল্পপত্রে যা লিখেছি তা বাস্তবায়ন করবই। পশ্চিমবঙ্গেও ইউনিফর্ম সিভিল কোড কার্যকর হবে, হবে এবং হবেই। ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে গোটা রাজ্যে একটিই আইন থাকবে।”
মুখ্যমন্ত্রী যখন এই বড় ঘোষণা করছিলেন, ঠিক তখনই বিধানসভার অন্দরে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Ritabrata Banerjee) নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কেরা ওয়েলে নেমে ইউসিসি বিলের তীব্র বিরোধিতা করে স্লোগান তুলতে থাকেন।
পাল্টা জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বিরোধীদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “যদি কারও কোনও আপত্তি বা ভিন্ন মতামত থাকে, তবে তারা সরাসরি রঞ্জনা দেশাইয়ের কমিটির কাছে গিয়ে নিজেদের বক্তব্য বা লিখিত আবেদন জমা দিতে পারেন। সবার গণতান্ত্রিক মতামত বিবেচনা করেই চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হবে।”
বাংলায় শুভেন্দু অধিকারী সরকারের এই পদক্ষেপ রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ ও দীর্ঘমেয়াদী বিতর্কের জন্ম দিল। আদিবাসী ও কুড়মিদের এই আইনের বাইরে রেখে সরকার যেমন একদিকে আদিবাসী ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করল, ঠিক তেমনই বিবাহ ও লিভ-ইন সম্পর্কের মতো বিষয়ে অভিন্ন আইনি কঠোরতা এনে বড় ধরণের সামাজিক সংস্কারের পথ প্রশস্ত করল।
পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি কার্যকর করার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেল। ২ জুলাইয়ের মন্ত্রিসভার বৈঠক এবং পরবর্তী চার সপ্তাহে বিচারপতি রঞ্জনা দেশাই কমিটির রিপোর্টের ওপর এখন সব মহলের নজর থাকবে। তৃণমূলের তীব্র রাজনৈতিক প্রতিরোধকে উড়িয়ে দিয়ে আগামী অগস্ট মাসে শুভেন্দু সরকার কীভাবে এই বিল বিধানসভার টেবিলে পাস করায়, তা দেখতে মুখিয়ে রয়েছে গোটা দেশের রাজনৈতিক মহল।






