সরকারি চাকরি ছেড়ে টুলু মণ্ডলের ম্যানেজার! মিনারের বাড়িতে সাড়ে ২৮ কোটি নগদ ও ১৫ কেজি সোনা উদ্ধার, ধৃত ১; ট্রাঙ্কের চাবি টুলুর কাছেই ছিল, দাবি স্ত্রীর

সরকারি চাকরি ছেড়ে একসময় বীরভূমের দাপুটে পাথরব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের সংস্থায় ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মিনার মণ্ডল। রাতারাতি ভাগ্যের চাকা ঘুরলেও সেই ‘সুখ’ যে বেশিদিন স্থায়ী হলো না, তা বোধহয় হাড়েনাহাড়ে টের পাচ্ছেন তিনি। বুধবার পুলিশের এক বিশাল অভিযানে মিনারের বাড়ি থেকে চোখ কপালে ওঠার মতো বিপুল অর্থ ও সোনা বাজেয়াপ্ত হওয়ার পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁকে।
সাড়ে ২৮ কোটি টাকা নগদ ও ১৫ কেজি সোনা উদ্ধার!
বুধবার গোপন সূত্রের ভিত্তিতে মিনার মণ্ডলের আবাসে হানাদারি চালায় পুলিশ। তল্লাশি চালাতেই বেরিয়ে আসে টাকার পাহাড় ও সোনার স্তূপ। হিসাবনিকাশ শেষে জানা যায়—
- মোট নগদ উদ্ধার হয়েছে সাড়ে ২৮ কোটি টাকা।
- এছাড়াও উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ১৫ কেজি নিখাদ সোনা।
ঘটনার পরপরই মিনার মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়।
[মিনারের বাড়িতে তল্লাশির সারসংক্ষেপ]
* বাজেয়াপ্ত নগদ অর্থ: ২৮.৫ কোটি টাকা।
* বাজেয়াপ্ত সোনা: ১৫ কেজি।
* মূল অভিযুক্তের পরিচয়: অনুব্রত ঘনিষ্ঠ পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের ম্যানেজার।
* অবস্থান/অঞ্চল: বীরভূম জেলা।
“আমাদের কিছুই নেই, পেনশনে চলে সংসার!”—স্ত্রীর চাঞ্চল্যকর দাবি
স্বামী গ্রেপ্তার হতেই মুখ খুলেছেন মিনারের স্ত্রী। তাঁর দাবি, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বা সোনার ব্যাপারে তাঁদের বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না।
তিনি জানান—
“আমার স্বামী সামান্য পেনশনের টাকায় সংসার চালান। আমাদের নিজেদের কোনো অঢেল সম্পত্তি নেই। প্রায় বছরখানেক আগে টুলু মণ্ডল নিজে এসে আমাদের বাড়িতে ওই বড় ট্রাঙ্কটি রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ভেতরে ওঁর কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রাখা আছে। ট্রাঙ্কটি তালাবন্ধ ছিল এবং তার চাবিও ছিল টুলু মণ্ডলের কাছেই। বুধবার পুলিশ এসে যখন তালা খোলে, তখনই আমরা প্রথম জানতে পারি যে ভেতরে এত টাকা ও সোনা রয়েছে!”
তবে পুলিশ ও তদন্তকারী আধিকারিকরা এই বয়ানকে স্রেফ আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবেই দেখছেন।
কে এই টুলু মণ্ডল? ভুয়ো DCR থেকে ১৫০ কোটির বিয়ে
মিনারের বাড়িতে এই বিপুল ধনরাশি উদ্ধারের পেছনে বারবার উঠে আসছে টুলু মণ্ডলের নাম। তৃণমূল জমানায় বীরভূম জেলায় বেআইনি পাথর ও বালি খাদানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছিলেন তিনি। অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত টুলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, নকল ডিসিআর (Duplicate Challan Receipt) বানিয়ে তিনি দৈনিক কোটি কোটি টাকা বাজার থেকে তুলতেন।
- রাজনৈতিক যোগসূত্র: অভিযোগ উঠেছে, এই বেআইনি উপার্জনের কোটি কোটি টাকা পৌঁছে যেত জেলা থেকে শুরু করে শাসকদলের শীর্ষ স্তরের নেতাদের কাছে।
- নিউটাউন কেস: বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে কলকাতার নিউটাউনে একটি বিলাসবহুল গাড়ি থেকে এসটিএফ (STF) ৫ কোটি টাকা উদ্ধার করেছিল, যাতে টুলু মণ্ডলের নাম জোরালোভাবে উঠে আসে।
- খুনের মামলা: ২০২২ সালে মহম্মদবাজার থানায় খুনের মামলা, বেআইনি অস্ত্র প্রদর্শন ও ঝামেলায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে টুলু মণ্ডলকে গ্রেপ্তারও করেছিল পুলিশ।
- ১৫০ কোটির মেগা ওয়েডিং: বছরদুয়েক আগে সিউড়িতে বলিউডের তাবড় তারকাদের উড়িয়ে এনে নিজের মেয়ের যে রাজকীয় বিয়ের আয়োজন করেছিলেন টুলু, তার আনুমানিক খরচ ছিল প্রায় ১৫০ কোটি টাকা! বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীসহ বিরোধী শিবির যা নিয়ে বিধানসভা ও রাজপথে সরব হয়েছিল।
এক নজরে ঘটনাপ্রবাহ:
| বিষয় | বিবরণ |
| মূল অভিযুক্ত/ধৃত | মিনার মণ্ডল (টুলু মণ্ডলের ম্যানেজার) |
| বাজেয়াপ্ত সম্পদ | ২৮.৫ কোটি টাকা নগদ ও ১৫ কেজি সোনা |
| অভিযোগের মূল কেন্দ্র | অনুব্রত ঘনিষ্ঠ টুলু মণ্ডলের বেআইনি বালি-পাথর ব্যবসার টাকা |
| পরিবারের দাবি | ট্রাঙ্কটি তালাবন্ধ রেখে গিয়েছিলেন টুলু মণ্ডল, চাবি ওঁর কাছেই ছিল |
| তদন্তকারী সংস্থা | পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট রাজস্ব বিভাগ |
বীরভূমের বালি ও পাথর ব্যবসার মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির যে অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠছে, মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া এই সাড়ে ২৮ কোটি টাকা ও ১৫ কেজি সোনা যেন তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, এই বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি সরিয়ে ফেলার পেছনে টুলু মণ্ডলের মূল কৌশল কী ছিল এবং এর পেছনে আরও বড় কোনো প্রভাবশালীর হাত রয়েছে কি না।






