হিংলো নদীর ভাঙনে বীরভূমে তলিয়ে গেল ১৮ বাড়ি, জলমগ্ন ঘাটাল

রাজ্যজুড়ে ফের জল-যন্ত্রণা। টানা ভারী বৃষ্টি এবং বিভিন্ন জলাধার থেকে জল ছাড়ার জেরে রাজ্যের একাধিক নদীর জলস্তর বেড়েছে। এর ফলে বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর, উত্তর ২৪ পরগনা-সহ একাধিক জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কোথাও নদীর জল ঢুকেছে লোকালয়ে, কোথাও আবার বাঁধে ধস নেমে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বীরভূমের দুবরাজপুর ব্লকের লোবা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায়। গত দু’দিনের ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি ড্যাম থেকে জল ছাড়ায় হিংলো নদীর জলস্তর বেড়ে যায়। এর জেরে নদীভাঙন শুরু হয় পলাশডাঙা ও দেবীপুর চর এলাকায়। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নদীগর্ভে তলিয়ে যায় ১৮টি বাড়ি।
স্থানীয় সূত্রে খবর, পলাশডাঙা গ্রামের আকুরেপাড়ায় ১৫টি এবং দেবীপুর চর এলাকায় তিনটি পরিবারের বাড়ি নদীর গ্রাসে চলে গিয়েছে। শুধু বাড়িই নয়, নদীর জলে তলিয়ে গিয়েছে চাষযোগ্য জমিও। কয়েকটি বাড়িতে নতুন করে ফাটল দেখা দেওয়ায় নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। যে কোনও মুহূর্তে আরও বাড়ি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বৃহস্পতিবার সকালে এলাকায় যান দুবরাজপুরের বিধায়ক অনুপ কুমার সাহা, বিডিও শুভজিৎ চ্যাটার্জী এবং থানার ওসি অমিত প্রামাণিক। তাঁরা পলাশডাঙা ও দেবীপুর চর পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের অস্থায়ী থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থানীয় স্কুলে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রুখতে বিষয়টি রাজ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের কাছে জানানো হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বিধায়ক।
অন্যদিকে, টানা বৃষ্টি এবং জলাধার থেকে জল ছাড়ার জেরে ফের জলমগ্ন ঘাটাল মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকা। শিলাবতী নদীর জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় ঘাটাল শহর এবং সংলগ্ন গ্রামীণ এলাকার নিচু অংশগুলিতে জল ঢুকে পড়েছে। ঘাটাল পুরসভার ১ থেকে ১০ নম্বর ওয়ার্ডের একাধিক এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। ২ নম্বর ওয়ার্ডের আরগোড়া এলাকায় রাজ্য সড়কের উপরেও জল জমেছে। জল ঢুকেছে শাড়ির দোকান-সহ একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও।
ঘাটাল ব্লকের অজবনগর ১ ও ২ গ্রাম পঞ্চায়েত-সহ বিভিন্ন নিচু এলাকাতেও জল ঢুকেছে। রাস্তাঘাটের একাংশ ডুবে যাওয়ায় কোথাও কোথাও নৌকা ও ডিঙির সাহায্যে যাতায়াত করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
এর মধ্যেই দাসপুরের সামাট গ্রামে কাঁসাই নদীর বাঁধে ধস নামায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কিছুটা দূরে বাঁধের মাটি আলগা হয়ে নদীর দিকে সরে যেতে শুরু করেছে। নদীর জলস্তর আরও বাড়লে ধসের অংশ আরও বড় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। মাঝপাড়া এলাকাতেও বাঁধের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগে এই এলাকাতেই নদীর বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ প্লাবনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনও তাঁদের মনে রয়েছে। ফলে ফের বাঁধে ধস নামায় আতঙ্ক বেড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কথা বলা হলেও জল-যন্ত্রণা থেকে এখনও স্থায়ী মুক্তি মেলেনি।
পুজোর আগে বাড়িঘর ও দোকানপাটে জল ঢুকে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাতেও রয়েছেন বহু মানুষ। পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আগেই জলমগ্ন এলাকাগুলি পরিদর্শন এবং কাঁসাই নদীর বাঁধের ধসপ্রবণ অংশ দ্রুত মেরামতের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঘাটালের বিধায়ক শীতল কপাট জানিয়েছেন, পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। জলমগ্ন এলাকার পরিস্থিতি এবং নদীগুলির জলস্তর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কাঁসাই নদীর বাঁধে ধসের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নদীর জলস্তর আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা থাকায় প্রশাসনের তৎপরতা নিয়ে নজর রয়েছে।






